৩১শে মে, ২০২০ ইং | ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বিলেতের স্বাস্থ্য সেবা

https://beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2020/04/kazi-arif-3rd.jpg

বলুনতো কেমন হতে পারে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা! উন্নত বিশ্বে কিভাবে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকে? আমার কিছুটা আগ্রহ ছিল এবিষয়ে জানার। যুক্তরাজ্যে এসে সে সম্পর্কে কিছুটা জানার ও সেবা নেওয়ার সুযোগ হয়েছে।

আমার মনে হয়েছে এখানে রোগীকে তারা অনেকটা অতিথি হিসেবে ট্রিট করে থাকেন। এখানে যেকোন জায়গায় সেবা নিতে গেলে প্রথমে তাঁরা জিজ্ঞাসা করবে, How can i help you? এবং সেবা দেওয়া শেষ হলে তাঁরা জিজ্ঞাসা করবে, Anything else that I can serve you now or today? তাদের মধ্যে কোন ক্লান্তি বা বিরক্তি দেখা যায় না।

এখানে ডাক্তারদের বলে General Practioner (GP)। প্রতিটি এলাকায় ভাগ ভাগ করে সার্জারি আছে। এটা এলাকার লোক সংখ্যা অনুসারে করেছে। সার্জারিতে সরকারিভাবে GP রোগী দেখে থাকেন। এদেশে স্বাস্থ্য সেবা হচ্ছে অধিকার। তবে আপনি যে এলাকায় আছেন সেখানে আপনাকে সার্জারিতে গিয়ে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। এরপর আপনি ডাক্তার দেখাতে পারবেন। ইউকে তে মোট জনসংখ্যা ৬৬.৬৫ মিলিয়ন (২০১৯ সালের তথ্য)। প্রতি ১০০০ জন লোকের জন্য ২.৮ জন ডাক্তার আছেন। মোট হাসপাতাল সংখ্যা (সরকারি ও বেসরকারি) মিলিয়ে ১২৫৭ টি। ২০১৯ সালে প্রায় ৩,০১,০০০ জন ডাক্তার যুক্তরাজ্যে রেজিস্ট্রেশন করেছেন। NHS এর হসপাতালে ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১,৫০,০০০ জন ডাক্তার এবং প্রায় ৩,২০,০০০ জন নার্স কাজ করছেন।

সবচেয়ে উল্লেখ করার মত বিষয় হলো, যদি কারো মিসেস এখানে প্রেগন্যান্ট হন তাহলে তার সেবা হয় এখানে অনেকটাই স্বর্গেরমত। এখানে বাচ্চা নেওয়াকে তারা উৎসাহ দিয়ে থাকে। বাচ্চা হলেই আঠারো বছর পর্যন্ত সরকার তাকে একটি ভাতা প্রদান করে থাকে এবং সে পর্যন্ত তার পড়াশোনার দায়িত্বও সরকারের। এখানে আপনার ছোট ছেলে/মেয়ে থাকলে ১৮ বছর পর্যন্ত এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা রেগুলার ব্যসিস-এ তাঁরা খোজ খবর নিবেন। আর আপনি স্বাস্থ্য চেকাআপ করাতে চাইলে সার্জারিতে গিয়ে বললেই তাঁরা রেগুলার ব্যসিস এ করে দিবে।

এখানে আপনি যদি ৯৯৯ এ ফোন দেন, তাহলে ইমারজেন্সি ব্যাসিসে এম্বুলেন্স চলে আসবে। আমি একদিন ডাক্তার এর জন্য ফোন দিতে গিয়ে ৯৯৯ এ ফোন দিয়েছিলাম, এক রিং বাজতেই ওপাশ থেকে আওয়াজ আসলো, Do you need Ambulance? Please tell me your address. আমি বললাম No, I’m looking for doctor. Wrongly I pressed this no. Ok no problem, bye. আমি যে বিষয়টি দেখে অবাক হলাম সেটি হলো এক রিং বাজতেই ফোনটি তুলে ফেললো। তখন জানতে পারলাম এদেশে ইমারজেন্সি কেস ইস ইমারজেন্সি। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, এ্যাম্বুলেন্স কত কম সময়ে তাঁরা সেবা দিতে পারে সেটা দিয়ে তাঁরা তাদের পারফরম্যান্স পরিমাপ করে।

আমার এক সিনিয়র কলিগের মেয়ের (১০ বছর) হঠাৎ পেটে ব্যাথা উঠেছিলো, সার্জারিতে গিয়ে দেখাতে তাঁরা বললো এপেন্ডিস এর ব্যাথা হয়েছে। তারপর তারা এমনভাবে বিষয়টি ডিল করলো, তা আপনাদের বিশ্বাসই হবে না। আল্লাহর রহমতে সে অল্প ক’দিনে সুস্থ্য হয়ে উঠেছিলো। এখানে প্রত্যেক এলাকায় একটি হাসপাতাল আছে। অবশ্যই সে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে জিপি থেকে রেফার করতে হবে। রোগী হাসপাতালে পৌঁছে গেলে, সব দায়িত্ব তাদের, আপনি শুধু দেখবেন, আর বসে থাকবেন। অনেক সময় তাঁরা আপনাকে চা/কফির অফারও করতে পারে।

এবার আসুন করোনা তারা কিভাবে মোকাবেলা করছে? এসময়ে কোন রোগীই সার্জারিতে এলাও/পারমিটেড না। সব চলছে ফোনের মাধ্যমে। প্রতিদিন (সোমবার থেকে শুক্রবার) সকাল ৮.৩০ থেকে ১০ টার মধ্যে আপনাকে ফোনে জিপিতে এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। শনিবার কিছু সেবা থাকে আর রবিবার বন্ধ। জরুরী সেবার জন্য আপনাকে জরুরী সেবার নম্বরে ফোন দিতে হবে। এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার পর একজন ডাক্তার আপনাকে ফোন দিবেন। কিছু বিশেষজ্ঞ নার্সও আছেন যারা রোগী দেখে থাকেন, তারাও ফোন দিতে পারেন। ফোন দিয়ে তিনি সব শুনে আপনাকে প্রেসক্রিপশন দিবেন। আপনার বাসার নিকটবর্তী কোন ফার্মাসিতে তারা অনলাইনে প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিবে, আপনি গিয়ে পাউন্ড দিয়ে সেখান থেকে ঔষধ কালেকশন করবেন। এখানে প্রতিটি ঔষধের দোকানে একজন ফার্মাসিস্ট অবশ্যই থাকতে হবে, অল্প কিছু ঔষধ ব্যাতিত অন্য কোন ঔষধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা নিষেধ। আর আপনি চাইলে ফার্মাসিস্ট এর সাথে কথা বা পরামর্শ করতে পারেন।

আর আপনি যদি সন্দেহজনক কোন করোনা রোগী হন, তাহলে এখানে আপনাকে অবশ্যই চৌদ্দ দিন বাসায় থাকতে হবে, এরপর আপনার খারাপ লাগলে বা করোনার সিমটম থাকলে ১১১ বা জরুরি সেবায় ফোন দিবেন। এম্বুলেন্স চলে আসবে আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। প্রতিটি এলাকার হাসপাতালে দুইটা জোন আছে একটি করোনা ও আরেকটি নরমাল জোন। তারা প্রতিটি হাসপাতালে দুইটি জোন করে ফেলেছে। হাসপাতালে গেলেই তারা সব পরীক্ষা করে রোগীর ব্যাবস্থা নিবে। আশ্চর্যজনক একটি বিষয় হচ্ছে, এখানে করোনা রোগী কিভাবে বাড়ছে তা বলা মুশকিল। লকডাউনে তাদের সব দোকান, রেস্টুরেন্টে, বার, শপিংমল বন্ধ। এরপরও তাদের রোগী এত কিভাবে হলো! এট আমার কাছে অদ্ভূদ লেগেছে।

করোনা যখন প্রথম দিকে বাড়লো বা ছড়াতে শুরু করলো, তখন এদেশের প্রধানমন্ত্রী সবার ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠিয়েছে। এসময়ে কি করতে হবে, আর কি করতে হবে না তা ঐ চিঠিতে লিখা ছিলো। আমিও প্রধানমন্ত্রী’র চিঠি পেয়েছি। তাঁরা বেশ কিছু হাসপাতাল (যেখানে করোনায় আক্রান্তের স্বম্ভাবনা বেশি) শুধু করোনার জন্য প্রস্তুত করেছে (উল্লেখ্য এগুলো আগে কমিউনিটি সেন্টার বা হোটেল ছিলো)। পাশাপাশি সকল এলাকার হাসপাতালগুলোকে রেডি করেছে।

এখানে স্বাস্থ্য সেবা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ ও মনিটর করে থাকে Department of Health & Social Care। স্বাস্থ্য সেবায় যারা কাজ করে থাকেন সেই সার্ভিসটির নাম NHS। যারা এ কাজের সাথে যুক্ত আছেন তাদেরকে এখানে বলা হচ্ছে National Heroes। যুক্তরাজ্যের সকল নাগরিক একদিন তাদেরকে সম্মান দিয়ে একসাথে করতালি দিয়েছে (Clap and cheer for all brave NHS heroes এতে তাঁরা সম্মানিত হয়েছে এবং অনেক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছিলো। যেটি আসলো আমাকেও অনেকটা ইমোশনাল করেছিলো। যুক্তরাজ্যে করোনা মোকাবেলার জন্য প্রত্যেক হাসপাতাল ও সার্জারিতে ভলেন্টিয়ার নিয়োগ করেছে। যার ইচ্ছা এখানে কাজ করতে পারবে এবং তাকে একটি সম্মানীও দেওয়া হবে।

উন্নত দেশ বলে মনে করার কোন কারন নেই যে এখানে সমস্যা নেই। তাদেরও সংকট এবং চাহিদা আছে। তবে তাঁরা সেটা সাহসিকতা ও আন্তরিকতার সাথে নিয়ে কাজ করছে। এখানেও অনেক স্বাথ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। এখানে তাদের কাজ সব সিস্টেমেটিক কোন রুমে কোন পিপিই পড়ে যাবে, তা সেলফে দেওয়াই থাকে। তাঁরা শুধু সেটাই পড়ে সেখানে যান। এখানে করোনা টেস্ট প্রতিদিন প্রায় ৪০,০০০ এর উপরে করা হয়। সরকার জানিয়েছে তাদের দিনে ৭৫,০০০ – ১,০০,০০০ টেস্ট করার স্বক্ষমতা আছে। আজ পর্যন্ত বিশ্বের মোট করোনা রোগীঃ ৩০,৯০,৮৪৪ এবং মৃত সংখ্যাঃ ২,১৫,০৬৩। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে আক্রান্তঃ ১,৬১,১৪৫ এবং মৃত ব্যক্তির সংখ্যাঃ ২১,৬৭৮। তাঁর এতো উন্নত সেবা দিয়ে যাচ্ছে তারপরও তাঁরা আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমাতে পারছে না।

এখানে, কয়েকটি জিনিস সবাই মানেঃ সময়, কাজ, দায়িত্ব, রিসপেক্ট। তাঁরা আপনাকে কোন বিষয়ে সাহায্য করতে না পারলে মনে হবে সে বেশ অপরাধী। আপনার কাছে এমনভাবে ক্ষমা চাইবে, আপনি তখন সেটা না পেলেও সন্তুষ্ট থাকবেন। আর কৃতজ্ঞতা খুব সুন্দরভাবে তাঁরা প্রকাশ করে থাকে।

আমরা এখানে পড়তে এসেছি (সাময়িক সময়ের জন্য) তাঁরা স্বাস্থ্য বীমা করে এসেছি। আর যারা এখানকার নাগরিক তাদের এটা করতে হয়নি। এখানে প্রাইভেট চিকিৎসা হয়, তাও নিয়মতান্ত্রিক। প্রাইভেটে ডাক্তার দেখাতে হলে তাকে অবশ্যই জিপি থেকে রেফার হয়ে আসতে হবে। আর যদি জিপি রেফার না করে, তাও সে দেখাতে পারবে তবে তাকে সঠিক কাগজ দেখিয়ে তাঁর এপয়ন্টমেন্ট নিতে হবে। এখানে যারা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তারাই প্রাইভেটে চেম্বার বা হাসপাতালে রোগী দেখেন। তবে এর সংখ্যা তেমন বেশি নয়।

আমার উপরের কোন কথা আমাদের দেশের সাথে তুলনা না করার জন্য অনুরোধ করা হলো। বিলেতে লোক সংখ্যা কম এবং তাঁরা বিশ্বের উন্নত দেশ। তাদের মত আমাদের এরকম চিন্তা করাটা এখন অনেকটাই বোকামী হবে। আমাদের দেশে লোক সংখ্যা অনেক বেশি এবং আমরা এখনো উন্নত বিশ্বের কাতারে আসতে পারিনি। তবে আমাদের স্বপ্ন আমরা আমাদের দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ্‌। যুক্তরাজ্যে ধনী, গরীব এবং গ্রামাঞ্চলের লোক আছে। কিন্তু প্রায় সব লোকই সচেতন। আমাদের দেশের সার্ভিস গ্রহিতা যারা (বিশেষ করে যারা গ্রামাঞ্চলে আছেন) তাদের অনেকেই সচেতন না। এ বিষটি আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের যারা স্বাস্থ্য সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন, তারাও দিন রাত পরিশ্রম করেন। তাঁরা এই কঠিন সময়ে লড়ে যাচ্ছেন, তাদেরকে বিনম্র শ্রদ্ধা। উন্নত বিশ্ব থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমাদের সে বিষয়গুলোকে পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।

(আমার এ লেখাটি আমি এখানে যা দেখেছি, তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। কোন তথ্য বিভ্রাট বা বানান ভুল থাকলে অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি)

লেখক- সরকারি কর্মকর্তা, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিয়ানীবাজার (এসেক্স, যুক্তরাজ্য)।

A+ A-

সর্বশেষ সংবাদ

বড়লেখায় চোরাই গরুসহ দুই পেশাদার চোর গ্রেফতার

ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়মিত করার দাবিতে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ

বিয়ানীবাজারে করোনায় মৃত বৃদ্ধের বাড়ি লকডাউন

এবারও এসএসসিতে বিয়ানীবাজারে সেরা খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যানিকেতন

বিয়ানীবাজারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনায় মৃত বৃদ্ধের জানাজা ও দাফন কার্য সম্পন্ন (ভিডিওসহ)

মোল্লাপুরের প্রবীণ মুরব্বী হাজী নুরুল ইসলাম’র ইন্তেকাল, জানাজা রাত ৯টায়

ঘোষণাঃ

Translate »