৩০শে মে, ২০২০ ইং | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

কাছ থেকে দেখা ডাক্তার মঈন উদ্দিন

https://beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2020/04/rijbi.jpg

সন্ধ্যা নামছে। রক্তিম আকাশে সূর্যটা ব্যথায় লাল হয়ে ব্যথাটা ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো আকাশ জুড়ে। ঘন মেঘগুলো কেমন যেনো লাল হয়ে যাওয়া আকাশকে জল দিয়ে ভিজিয়ে দিতে চাইছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করেছে। চারিদিকে ঘন সবুজের গম্ভীর নিস্তব্ধতা । মাঝে পিচঢালা রাস্তার বুক চিরে ছুটে চলেছে একটি সরকারি কালো মাইক্রোবাস। সুনসান রাস্তায় মৃত্যুপূরীর নীরবতা। পেছনে যতদৃর চোখ যায় কোন যানবাহনের চিহ্ন নেই। সামনে একটি লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যান। পেছনে মাইক্রোবাসে আমি, আমার ছোট্ট বোন আর ড্রাইভার সাহেব।

চলাচলে লকডাউনের জন্য বিধিনিষেধ চলছে। রাস্তায় কিছুদূর পরপর পুলিশের চেকপোস্ট। কোন বিশেষ কারণ ছাড়া এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা।করোনা মহামারি জেকে বসেছে। মাইক্রোবাসে আমি আর আমার বোন রিফাত। কিছুটা দূরত্ব রেখে পেছনে দুই জন দুই সারিতে বসে আছি। আমার ছোট্ট বোনটা একটু পর পর কিছু প্রশ্ন করে থেমে থেমে কেদেঁ উঠছে। আমি ছোটবেলা থেকেই যেকোন বিষয়ে আটকে গেলেই পথ বাতলে দিতাম। এখন উত্তরে কিছু বলতে পারছি না। আমার চোখটা ভিজে যাচ্ছে ডাক্তার মঈন উদ্দিন ভাইয়ের দেহান্তরে। আমার বড় ভাইটা মরে গেছে। আমার ভাই শহীদ হয়ে গেল। এলোমেলো ভাবে স্মৃতির অতলে চলে যাচ্ছি বার বার।

একসাথে যাচ্ছিলাম সিলেট থেকে ছাতকের নাদামপুর গ্রামে মঈন ভাইয়ের গ্রামের বাড়ীতে। উদ্দেশ্য জানতাম না। যেতে যেতে বললেন একটি ফটিক (বাইরের মিটিং রুম) বানিয়েছি। একতলা টিনসেড ঘর। এটাকে আরামদায়ক করে দিতে হবে। অপেক্ষার কক্ষে বসা লোক যেন অরামে বসে এক কাপ চা খেতে পারেন। বাথরুমটাও যেন রুচিশীল এবং সহজ ব্যবহারযোগ্য হয়। এগুলো কেন করছিলেন জানেন? শুধু গ্রামের গরীব লোকগুলোকে বিনে পয়সায় রুগী দেখার ব্যবস্থা করতে। প্রতি শুক্রবার কিংবা সুবিধাজনক সময়ে ওখানে বসতেন। অমূল্য সময় আর বিনামূল্যে সেবা বিলিয়ে দেবার সুযোগ নিজেই করে নিলেন। কেউ প্রশংসা করলে বলতেন, “যদি এলাকায় একটা ফ্রি হাসপাতাল করতে পারতাম যেখানে সব ধরণের রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকতেন, তাহলে কিছু করার মত হত।“ এভাবে কি ধনী হওয়া যায়? ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছে আমার ভাই। এ সময়টা স্বার্থপরদের।

ছাতকে নাদামপুরের যে জায়গা থেকে উঠে এসে ঢাকা মেডিকেল থেকে ডাক্তারী পাস করে এফ সি পি এস আর এম ডি শেষ করেছেন, কতটুকু মেধাবী হলে তা সম্ভব সহজেই অনুমেয়। তার উপর খুব ছোটবেলা থেকে পিতৃহীন ছিলেন। আমার জীবনে দুজন ফটোজেনিক মেমরির লোক দেখেছি। একজন জাতীয় অধ্যাপক প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী। আরেকজন ডাক্তার মঈন উদ্দিন। দুজনেই পরপারে। যখন কোন চ্যানেলে নিউজ শুরু হত মঈন ভাইকে বলতাম ভালো করে দেখেন নিউজ শেষে কিছু প্রশ্ন হবে। নিউজ শেষে প্রশ্ন করার সুযোগ হত না। এক ঘন্টার নিউজটি গড় গড় করে বলে যেতেন ডাক্তার মঈন উদ্দিন ডাটা গুলো সহ। যখন কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করতেন হাজার ডাকেও সাড়া মিলত না।

শুধু এক কাপ চা পেলেই ডাক্তার সাহেব খুশী হয়ে যেত। কোন চাহিদা ছিল না, কোন অভিযোগ ছিল না কারো বিরুদ্ধে। ছোট ছোট গিফট পেলে খুশী ফুটে উঠত চোখে মুখে। সবাইকে বলতেন অমুক সাহেব আমার কথা মনে করে আমার জন্য কলম এনেছেন। ছেলে দুটি তার চোখের মণি ছিল। বড় ছেলে জিয়াদের ব্রেন ডেভেলপমেন্ট সমস্যা থাকার পরেও কখনো আফসোস করতেন না। ধৈর্য আর চেষ্টা করে যেতেন মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে। ছোট ছেলে জায়ান মাত্র সাত বছর বয়স। বাবা নাই কথাটা বুঝার বয়স হয়নি।

প্রতিদিন এক ঘন্টা আগে চেম্বারে চলে যেতেন। কারণ কি? গরীব রুগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সময়। গরীব লোকগুলো জানত এইসসময়ে ডাক্তার মঈন উদ্দিন বিনা খরচে চিকিৎসা দিবেন। শুধু তাই নয় বিনা পয়সায় ঔষধও পাওয়া যাবে। যদি বেশী প্রয়োজন হয়, কিছু টাকা পয়সা উনার থেকে নিয়ে আসা যাবে। আবার এই নির্দিষ্ট সময়ে আসা ধনী লোকের থেকেও সম্মানী নিতেন না মঈন উদ্দিন।

গাড়ী নরসিংদী পার হয়ে ভৈরবের কাছাকাছি এসে থেমে গেছে। খাবারের সন্ধানে ড্রাইভারদ্বয় এদিকে ওদিকে খুজে ছোটখাট রেষ্টুরেন্ট বের করে নিল। সাদা পিপিই স্যূট পরে আমি আর আমার বোন বসে আছি। একের পর এক ফোন আসছে। কি করব, কিভাবে জানাজাতে শরীক হওয়া যাবে? সবাই জানতে চাচ্ছেন। কোন জবাব দেওয়া যাচ্ছেনা। জানাজা হবে খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে। এমন একটা রোগ, জানাজা পর্যন্ত কোনমতে করা লাগবে। আমি কোন জবাব দিতে পারছিনা। মোবাইল বন্ধ করে দিলাম। আমার বোন শক্ত হয়ে গেছে। আর কাদছেনা। আমি আবারো মঈন ভাইয়ের স্মৃতিতে ডুবে গেলাম।

মঈন ভাইয়ের তিন বোন। তিনজনই স্কুল টিচার। তিন বোন, বোন জামাই আর ভাগ্না ভাগ্নীদের গার্জিয়ান ছিলেন। যেকোন বিষয়ে গাইড এবং বাড়ির দেখাশুনা একাই করতেন। বড় ভাই ছিলেন একজন। মারা গেলেন মাস তিনেক আগে। ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন বড়ভাইকে কাছে থেকে দেখা করে কথা বলতে। কোন ঈদ কিংবা অন্য কোন অনুষ্ঠানে যখন বাড়ী যেতেন, নিজে আগে ফ্যামিলি নিয়ে গিয়ে যোগাড়যন্ত্র করে রাখতেন যাতে বোনেরা স্বাভাবিক ভাবে বাপের বাড়িতে আসতে পারেন।

নামাজ পড়তেন নিয়মিত। মসজিদে যেতেন। ছোট ছেলেকে আর আব্বাকে সুযোগ পেলেই একসাথে নিয়ে যেতেন। রুটিনে বাধা জীবন ছিল মঈন ভাইয়ের। সকালে ঘুম থেকে উঠে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়া, অতঃপর এক ঘন্টা হাটা, পানাহার করত স্কুলে বাচ্চাদের দিয়ে হাসপাতালে, হাসপাতাল থেকে দুপুর দুইটায় বাসায় এসে জোহরের নামাজ, মধ্যাহ্নভোজ আর আসরের নামাজ পর্যন্ত ঘুম, বিকেলে প্রাইভেট চেম্বারে গিয়ে রাত একটা থেকে দুটোর মধ্যে বাড়ি ফেরা এবং রাতে দুটোর দিকে ডিনার করে ঘুমানো। স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন। খাওয়া দাওয়া ছিল সীমিত। ছিল না ধূমপান কিংবা অন্য কোন বদভ্যাস।

দূর্ভাগ্যক্রমে করোনা পজিটিভ হল পাঁচ ই এপ্রিল, ২০২০। শারীরিক ভাবে ফিট থাকাতে দুশ্চিন্তা হয়নি। অক্সিজেন বাসায় নিয়েছিলেন। ভরসা করেছিলেন নিজ শহরের আর নিজের দেশের চিকিৎসার উপর। কূর্মিটুলা জেনারেল হাসপাতালে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেন ডাক্তাররা। কিন্তু সবার চেষ্টাকে বিফল করে দিয়ে পনেরো এপ্রিল ভোরবেলা না ফেরার দেশে চলে গেলেন গরীবের ডাক্তার মঈন উদ্দিন।

আমরা সিলেটে পৌছে গেছি। মঈন ভাইয়ের লাশবাহী গাড়ি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়ে মঈন ভাইয়ের সাথে ইহজাগতিক শেষ সম্পর্ক ছিন্ন হল আমার বোন আর আমার। আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আমার বোন আর ভাগ্নেদের ক্ষতি অবর্ণনীয় । দেশের ক্ষতি হয়ে গেল। গরীবের ডাক্তার আর আসবে না। এত দিল দরিয়া চিন্তাও কেউ করবে না।

আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে আসীন করেন। আমিন।

লেখক- করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিহত শহীদ ডাক্তার মঈন উদ্দীনের নিকটাত্মীয়।

‘এবি টিভি’র সর্বশেষ প্রতিবেদন-

A+ A-

সর্বশেষ সংবাদ

গোলাপগঞ্জ স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের নার্স করোনায় আক্রান্ত

বিয়ানীবাজারের প্রথম উপসর্গযুক্ত করোনা রোগী ব্যবসায়ী কুনু মিয়া

সিলেটের ওসমানী ল্যাবে ৩১ জনের করোনা পজেটিভ শনাক্ত

সিলেটে র‍্যাব-৯ এর ১৩ সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত

বিয়ানীবাজারে নতুন আরও ২জন করোনা রোগী শনাক্ত

বিয়ানীবাজারে পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

ঘোষণাঃ

Translate »