৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

‘ওই যে গেলো নুর আর আইলো না’

https://beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2019/12/suruja-bibi-1200x630.jpg

যুদ্ধের সময় আমার ফুয়া (ছেলে) ১০/১৫ দিন পর পর রাইতে (রাতে) বাড়ি আইতো। পাঞ্জাবি আর রাজাকারদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে পিছনের দোয়ারে টোকা দিতো। মুই (আমি) বলতাম নুর-নি-বা, আইছতনি। হারা (সারা) রাইত ফুয়ার লাগি বসে রইতাম, ঘুমাইতাম না। কোন দিন আইবো, কোন সময় আইবো তার কোন ঠিক থাকতো না। ওই ফুয়া যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালো বাড়ি তনে (থেকে) বাপর লগে রাগ করিয়া চইলা গেলো। আর আইলো না। (চোখের পানি মুছে) বাছিয়া আছে না মরে গেছে কেউ জানইন না। বাছিয়া থাকলে ফুয়া তার মাইরে দেখাত আইলো ওনে। তার লগের (সাথের) মুক্তিযোদ্ধা ফারুক (আবদুল মালীক ফারুক) ও দিলুর সাথে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চিঠি দিতো। খানো (কোথায়) আছে ওই চিঠি দেখিয়া বুঝা যাইতো না। দুইটা চিঠি দিছিলো। ফারুকে মোরে (আমাকে) কইছে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব মারা যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা আরেকটা যুদ্ধ করে। চাচি গো নুর মনে হয় ওই যুদ্ধে যোগ দিছিলো। (একটু ঝিরিয়ে নেন, ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে একটি চোখ ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছেন, অপর চোখের অল্প দেখতে পান)।

হে (নুর উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা ৪ নং সেক্টর) যে দিন যুদ্ধে যায় তখন বৈশাখ মাস। কয়দিন থেকে খালি ছটফট ছটফট করে। মুই (আমি) কই কিতা-বা, তুই এতো তাইস (হাহুতাশ) করছো খেনে। মোরে কিচ্ছু কয়না। নাগো মাই এমনি কিচ্ছু বাল্লাগছেনা। মুই যদি জানতাম হে যুদ্ধ যাইবো গি। কইতাম মোরে লগে নে। মোরে লগে নিতো পারত না- হেও যাইতে পারতো না (বলে হেসে ওঠেন) কিন্তু আমার কলাপ, কিচ্ছু বুঝিনী। (দ্বীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলেন) বিয়ানে (সকালে) তারে ভাত দিয়া মুই ভাত খাই। হে আমার ফয়লা ফুয়া। বিয়ার এগার বছর পর তার জন্ম। আমার কলিজা টুকরা একটা শার্ট পিন্দি (পরে) ঘর তনে বারইয়া গেলোগি। মুই দরজা দাড়াইয়া দেখি তার লগের আরও ৪/৫ ফুয়া। মোর মনে ওইছে কোন খেলাত যার। দিন গিয়া রাত ওইজার নুর উদ্দিনের কোন হদিস নাই। যারে জিগাই তারা মোরে কও ‘কই গেছোইন কাজ শেষ ওইলে আইবা’। ইলা (এভাবে) করে এক মাস যায়। মুই সারা রাইত জাইগা থাকি। একদিন পিছনের দরজায় আস্তে আস্তে ডাক ফুনি (শুনি) মাই গো ও মাই। মোর কানে নুরের গলার আওয়াজ এর মতো লাগলো। তার বাপরে বুঝতে না দিয়া খলে খলে (আস্তে আস্তে) বিছানা থেকে উঠে দোয়ার খুলি। দেখি আমার নূর। গাল ভর্তি দাড়ি, পিন্দো (পরনে) শার্ট আর পেন্ট। ফুয়ার বুকে মাথা রাখি। ফুয়ারে কান্দাত (কাছে) পাইয়া খুশিতে এতো কান্দিছি (কাঁদছি) যে মোর কাছে মনে ওইছে কেউ আসমানের চান্দ আনি মোর আতো (হাতে) দিলাইছে। তার বাপরে ডাকতে গেলে হে বাধা দেয়। বাপরে খুব ডরাইতো। ফুয়া পাইয়া মুই বোবা ওই গেলাম। হে আমারে কইলো মাইগো ঘরে কিচ্ছু খাওয়ার আছেনি। থাকলে দেও। খুব বোগ (খিদা) লাগছে। ভাত দিয়ে তারে কই অতো দিন কিতা খাইলায়? হে প্লেটের দিকে চোখ রাইখা এক কামড় ভাত মুখে দিয়ে বলে বাঁশের করিল খাইছি। ক্যাম্পে গেলে ভাত-ছালম (তরকারি) পাওয়া যায়। বাক্কাদিন ক্যাম্পে যাই না। নুর ভাত খাওয়া শেষ করতে পারে না। তার লগের কে ডাক দেয়। তাড়াহুড়া করে ঘর থেকে বারইয়া যাওয়াত লাগে। পিছন থেকে তারে ঝাপটা মারি ধরি। নুর ও বাজান কই যাস? মাইগো মোরে যাইতে দেও, যুদ্ধ শেষ খরি বাড়িত আইমু। আর মাঝে মাঝে ওলা রাইতে তোমারে দেখাত আইমু। মুই তার গলা ছাড়ি না। সে মোরে কও; ও-মাই আতো সময় নাই। বিয়ান ওয়ার আগে ই-এলাকা ছাড়তে অইবো। মোর হুশ ওয়, ফুয়ারে ছাইলেও রাখতাম পারতাম নায়। কই, তোড়া উবা (একটু দাড়া) বলে ভিতর ঘর তনে খই, আমন ধানের ছিড়া আর তোড়া (অল্প) গুড় গামছায় মছা বান্দিয়া দেই। কই হখলরে লইয়া খাইছ্।

নুর ১০/১৫ দিন পর পর রাইতে বাড়ি আয় মুই তারে ভাত খাইতে দেই। ফুয়ার লাগি সারা রাইত জাগিয়া থাকি। (চোখ মুছেন, কথা বলার সময় গাল বেয়ে অনবরত চোখের পানি ঝরছে)। রাজাকাররা (নাম বলতে পারেননি) খবর পাইলায় নুর মোরে দেখতে বাড়িত আয়। ইতায় ফড় (পাহারা) দিতা শুরু করলা বাড়ির তলে, (টিলা বাড়ির নিচে)। ওতার মাঝে আরেকদিন নুর আইছে। মুই তারে ভাত খাওয়াইয়া কাপড় দিয়া মুখ মুছাইয়া বলি বাজান আর আইও-না। ইতায় হুনলে পাঞ্জাবিরে খবর কইলাইব (বলে দেবে)। নুর কান্দো (কাদে) রাখা বন্দুক দেখাইয়া বলে মাইগো ইটা লগে থাকলে কোন ডর নাই। পাঞ্জাবির বেটা কান্দাত (কাছে) আওয়ার আগে উড়াইয়া দিমু। নুর চলে যায়। (দুই ঠোঁট কাঁপছে, কথা বলতে পারছে না। অনেক্ষণ সবাই নিরব, মায়ের কাছে তার দিনমজুর দুই ছেলে ও মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালীক ফারুক বসা, তারাও কাঁদছেন।)

তখন আড় মাসো (আষাঢ় মাস)। মোর কাকরদিয়া গ্রামের বেয়াই লেচু মিয়ার ভাতিজার হউর (শ্বশুড়) একদিন বিয়ানে আইয়া নুরের বাপের লগে কিতা মাইতইন ( সাথে কি আলাপ করেন)। নুরের বাপ বাদে মুই ৩ফুয়া ও ২ফুড়িরে (৩ ছেলে ও ২ মেয়ে) তান (তার) হউর বাড়ি গড়ুয়া গ্রামে লইয়া গেলা। একটা খালি ঘরে থাকতে দিলা। এরপর এক দুইদিন পর পর বেয়াই আমরারে দেখতে আইতা। এর মাঝে একদিন নুর বাড়িত আয়। ঘরের দরজায় ডাক দিয়া মোরে পায় না। কিতা খরি পাঞ্জাবিরা খবর পাইলায়। নুর কোন মতে পিছন দিক দিয়া পালিয়ে যায়। বেশ দূরে যাইতে পারেনা। সব বায় (সব দিক) তনে টর্চ লাইটের আলো জ্বলতে থাকে। আমার দেউর (দেবর) মোহাম্মদ আলীর বউ মুহিবুন নেছা প্রশাব করতে বারইছন। দেখইন নুর উদ্দিন তান ঘরের পিছনে লুকাইয়া আছে। মুহিবুন নেছা সাহস খরি নুররে তান ভাঙ্গা একটা ঘরের ভিতর নিয়া রাখইন। ওই ঘরে নুর তিন দিন দুই রাইত আটকা আছিল। রাইত মোর জাল মুহিবুন নেছা নুররে খাইতে দিতা। তার কাছে হুনছে আমরা গড়ুয়া গ্রামে চলে গেছি। হেই (সেই) সময় মোহাম্মদ আলী আর মুহিবুন নেছা ছাড়া কেউ আমরার লগে আছিল না। হখলে রাজাকারদের ডরাইতা। সুযোগ পাইয়া নুর তিন নম্বর দিন রাইত ইখান তনে (এজায়গা থেকে) যায়গি। আর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে আইছিলো।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নুর উদ্দিন আবার পড়তে চায়। হে ক্লাস টেইনে (দশম) পড়তো। তার বাপের লাকড়ির দোকান বিয়ানীবাজারে আছিল। বাপে কইতা তুই আমার বড় ফুয়া। পড়িয়া কিতা করবে। মরে ব্যবসায় সাদ-দে (সাহায্য কর)। ইতা নিয়া বাপ-ফুয়ার মাঝে দরবার (ঝগড়া) ওয়। একদিন ফযরের নামাজ পড়ার লাগি ওজু করতে পুকইরে (পুকুরে) গেছি। দেখী নুরও ঘুম তনে উঠি গেছে। অতো বিয়ানে হে ঘুম তনে উঠে না। নামাজ শেষ কইরা নুর ওনুর কই গেলিরে বলে ডাকতে থাকি। মোর লাগা ঘরের বাউরঝি (পাশের ঘরের ভাশুরের মেয়ে) আফলাতুন নেছা বলে ভাইরে দেখছি ওবায় শার্ট ফিন্দিয়া কই যাইতরা। ওই যে গেলো নুর আর আইলো না।

মুক্তিযোদ্ধা নুর উদ্দিনের জননী সুুরুজা বিবি (৮৭)। (২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর এ সাক্ষাতকার নেয়ার দুই বছর পর তিনি মারা যান। বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের মালিগ্রামের মরহুম আবদুল আজিজের স্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা নুর উদ্দিনের জননী। নুর উদ্দিন ৪ নং সেক্টরের সম্মুখ যোদ্ধা ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পিতা আবদুল আজিজের সাথে মনকষাকষির পর বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এর পর তার সাথে পরিবারের কারো কোন যোগাযোগ ছিল না। এমনকি এই সময়ের মধ্যে সহযোদ্ধা বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালীক ফারুক ও দিলুকে দুইবার চিঠি দেন। কিন্তু কোথায় থেকে চিঠি লিখেছেন সেই ঠিকানা ছিল না। এমনকি ডাকঘরের স্মারক নম্বরটিও ছিল ঝাপসা। ১৯৭২ সাল থেকে আজঅবধি বাড়ি ফেরেননি)। আহমেদ ফয়সালের অনুলিখনে অপ্রকাশিত এ সাক্ষাতকার বিয়ানীবাজার নিউজ ২৪এর পাঠকের জন্য প্রকাশ করা হলো।

 

A+ A-

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন পোর্টালসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার- প্রতিবাদ জানিয়েছেন বড়লেখার আলতাব

সড়কে গেলো প্রাণ, বিয়ানীবাজারে বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা হলো না তাহেরের

বৈরাগীবাজারে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পেইন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

বিয়ানীবাজারে শুরু হচ্ছে দ্বৈত্য ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট, উদ্বোধন ১৭ ডিসেম্বর

জাতীয় পার্টির সম্মেলন- প্রস্তুতি কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বিয়ানীবাজারের ৩জন

কাল শনিবার বিয়ানীবাজারে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে

ঘোষণাঃ

Translate »