আজ একটু স্বস্তি। ফেসবুকে অনেকেরই পোস্টে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি, কথা, স্মৃতিচারণা, কবিতা, উপন্যাস, গদ্য সাহিত্যের উল্লেখ। ফেসবুকের দৌলতে মাঝে মাঝে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যখন নিজেকে বাংলা সাহিত্যের একজন খুঁজেপেতে বুঝে পড়া পড়ুয়া ভাবতেও সন্দেহ হয়। যে আবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিষয়ে ছোটখাটো গবেষণা করে থাকে। তবে সেসব বড় কিছু নয়। ছোট মানুষের ছোট কাজ। কম মেধাসম্পন্ন মানুষের বোধবুদ্ধি কম হওয়ায়টাই স্বাভাবিক। সেই অল্প বোধ নিয়ে মনে হয় বুদ্ধদেব পরবর্তী বাংলা কবিতার ভাষাশৈলীর বদলে কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে জড়িত মানুষজনদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। ঠিক যেমন শতভিষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আলোক সরকার, দীপঙ্কর দাশগুপ্তদেরও আছে। আছে কোনও অবস্থানে না থাকা সেই সময়কার বিনয় মজুমদার, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্তদের। গৌতম বসু একবার একটা লেখায় খুব মারাত্মক এক কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, প্রতি দশকের মেজর পোয়েটদের পাশাপাশি মাইনর পোয়েটদেরও ভাষাশৈলীর মোড় ঘোরাতে একটা ভূমিকা থাকে। সেই ভূমিকা থেকেই পঞ্চাশ দশকে আমরা আলাদা অবস্থানে চিহ্নিত করতে পারি শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কবিকে ।

প্রথমেই বলেছি আমার বিদ্যাবুদ্ধি যথেষ্ট কম। বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ ঐশ্বর্য এখনও পর্যন্ত পড়ে শেষ করতে পারিনি। বিদেশী তথা ইংরেজি সাহিত্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ল্যাসিক ছাড়া বেশি কিছু আমার পড়া হয়ে ওঠেনি এখনও । যেহেতু আমি বাংলা ভাষা সাহিত্যের সঙ্গে জড়িয়ে গবেষণা ও লেখালেখি সূত্রে তাই আমার কম ধীশক্তি নিয়ে এটা বুঝি পঞ্চাশ দশকের বাংলা কবিতার ভাষাশৈলীর মোড় বদলাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। যদিও এখনকার বিদেশী সাহিত্য বেশি পড়া অথচ বাংলা ভাষায় কবিতা লিখিয়ে কিছুজন বিশ্বাস করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতাটা ঠিক লিখতে পারেন না। যেমন এঁদের অনেকেই বিশ্বাস করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি নন। তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ ঔপন্যাসিক? তা তাও তো নন। ফেসবুকে দশটা বা কুড়িটা উপন্যাসের কথা বলতে গিয়ে যেখানে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত, সেখানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থাকবেন সেটা কী হতে পারে? সুনীল না পারলেন কবিতা লিখতে, না উপন্যাস লিখতে। অথচ সুনীল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খ্যাতিমান। আমাদের একটি ধারণা আছে খ্যাতির পেছনে কেবল বড় পত্রিকার ভূমিকা। এটা ঠিক বড় পত্রিকা, বড় প্রকাশনা একজন লিখিয়েকে অনেকখানি আলো দেয়। তবে সে আলো কাজ করে না যদি তিনি পাঠক তৈরি করতে না পারেন। একজন লেখকের লেখার পাশাপাশি আরেকটা কাজ হল পাঠক তৈরি করা। একজন লেখক কীভাবে পাঠক তৈরি করতে পারেন? লেখক পাঠক তৈরি করতে পারেন তাঁর ভাষা দিয়ে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এমন এক মনকেমনের ভাষা জানেন যা পাঠককে ছুঁতে পারে অনায়াসে। যাঁরা বড় জায়গায় থাকেন তাঁদের ইচ্ছে ও অনিচ্ছে নিয়ে অনেক কাজ করতে হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে তাই প্রচুর লিখতে হয়েছে। এর ভেতর অনেক অলেখা তাঁকে লিখতে হয়েছে। তার মানে তো এই নয় বাংলা উপন্যাস ও কবিতাচর্চাতে এই ভদ্রলোকের কোনও অবদান নেই। লক্ষ লক্ষ পাঠক পড়েছেন যে লেখককে তিনি লিখতে পারেন না এটা যাঁরা প্রমাণ করতে চান তাঁদের মেধা ও বুদ্ধি বেশি থাকতে পারে কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন প্রধান প্রতিনিধি হতে গেলে তাঁদের এখনও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। যে লেখকরা বলছেন তাঁদের সবিনয়ে প্রশ্ন একটা পূর্ব পশ্চিম, একটা সেই সময়, একটা প্রথম আলো না হয় আপনারাই লিখুন না। কত গবেষণা করতে পারলে একটা যুগকে ধরা যায়, সুনীলের প্রথম আলো আর সেই সময় সেই যুগ অনুসন্ধানের ফসল। সুনীলকে নস্যাৎ করা যায়, প্রিয় তালিকা থেকে ছেঁটে দেওয়াও যায় তবে তাঁর মতো খ্যাতিমান হওয়ার জন্য সম্ভাবনা তৈরি করে আসরে নামতে হয়। অরণ্যের দিনরাত্রি খাঁজা। সত্যজিৎ রায় পরিচালক হিসেবে ঋত্বিকের থেকে কম মেধাসম্পন্ন এসব খুবই অবিবেচনার কথা। যেমন অবিবেচনার, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও উপন্যাস না লিখতে পারাটা। এটা বলার আগে একথা মাথাতে রাখা জরুরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামক এই ভদ্রলোককে ছন্দভাষা ও গদ্যভাষা তৈরি করে কবিতা ও উপন্যাস লিখতে হয়েছে। জীবনানন্দের হাতে তৈরি এক ছন্দফর্ম ছিল। রবি ঠাকুরের তা ছিল না। তিনি বাংলা কবিতা ও গদ্যচর্চার রাজত্বে আইকন। যেমন বাংলা উপন্যাসের ভাষাশৈলীতে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান অস্বীকার মানে আমাদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঠিক খোঁজখবর না রাখার একটা পর্যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষাকে অস্বীকারও তেমন এক পর্যায়। যে পর্যায়ে মিশে আছে বাংলা ভাষা সাহিত্যের শৈলীটি নিয়ে প্রকৃত নাড়াচাড়ার অপারগতা। আজ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে পাঠকদের এত পোস্ট এটাই প্রমাণ করে তিনিও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন প্রধান আইকন। একথা অস্বীকারের উপায় নেই।আর পাঠককে কখনও কম মেধাসম্পন্ন ভাবতে নেই। পাঠকই লেখক তৈরি করেন, পাঠকই লেখককে বর্জন করেন। পাঠকই একমাত্র লেখকের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

লেখক- কবি ও গবেষক, পশ্চিমবঙ্গ।