একটি ষাড় বদলে দিয়েছে তরুণ সাহেদের দিন। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান সাহেদ যখন দিনের বেশিরভাগ সময় কাটায় ডেইরি ফার্মে- তখন বন্ধুরা তাকে নিয়ে মশকরা করতো। অথচ মাত্র চার বছরের মধ্যে সাহেদ হয়ে উঠেছে অন্য তরুণদের অনুপ্রেরণা। যেসব বন্ধুরা সাহেদকে নিয়ে হাসি-টাট্টা করতো তারাও আজ সাহেদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সাহেদ আহমদ বলেন, “বিগবস’ আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। এবারের কোরবানির হাটে বিগবসকে বিক্রি করে দেব।” স্থানীয়ভাবে চাহিদা মতো দাম না পেলে বিগবসকে ঢাকার গাবতলী হাটে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা রয়েছে এ তরুণের।

সিলেট অঞ্চলের অধিকাংশ তরুণদের মতো সাহেদ আহমদ (২৬)ও ইউরোপ যেতে কয়েকবার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত ইউরোপ যেতে না পারায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী মামা নজরুল ইসলাম লোদী ও বড়ভাই সুমন আলীর অনুপ্রেরণা এবং আর্থিক সহযোগিতায় ডেইরি ফার্ম গড়ে তুলেন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ গ্রাম মাথিউরায়। ২০১৫ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নের পশ্চিমপাড় এলাকার নিজবাড়িতে ৭টি ফ্রিজিয়ান প্রজাতির গাভী দিয়ে শুরু করেন ‘সাহেদ ডেইরি ফার্ম। বর্তমানে তাঁর ফার্মে ১০টি গাভী, ১০টি বাছুর ও বিগবসসহ ৫টি ষাড় রয়েছে।

সাহেদের ডেইরি ফার্মে বেড়ে ওঠা ফ্রিজিয়ান প্রজাতির ষাড় ‘বিগবস’ চার বছরে ১১ ফুট দৈর্ঘ, ৮ ফুট ব্যাস এবং ৬ফুট উচ্চতার বিশালকায় পশুতে পরিণত হয়েছে। ৩৫ মনের বেশি ওজন ও আকৃতির দিক থেকে দেশে লালন পালন করা বৃহৎ তিনটি গরুর মধ্যেই ‘বিগবস’ জায়গা করে নেবে বলে মনে করেন সাহেদ ও উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের দায়িত্বশীলরা। এর মধ্যে ঢাকা সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা ষাড়টির দরদাম করছেন।

সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে বিগবসকে পালন করেন সাহেদ। প্রতিদিন ১৫ কেজি দানাদার, ১২ কেজি আঁশ এবং দেড়মন ঘাস দিতে হয়। এছাড়া খাবারের তালিকায় রয়েছে সপ্তাহে ৬ কেজি গাজর।

সাহেদ আহমদ বলেন, আমরা দুই ভাই। বড়ভাই যুক্তরাজ্যে থাকেন। বাবা-মা চাইছিলেন আমি যুক্তরাজ্যে চলে যাই। আমারও ইচ্ছা ছিল লন্ডন যেতে। কয়েকবার চেষ্টা করে যেতে না পেরে আমি যখন হতাশ হয়ে পড়ি তখন যুক্তরাজ্য প্রবাসী মামা ও বড়ভাই ডেইরি ফার্ম গড়ে তোলার কথা জানান। তাদের অনুপ্রেরণা ও আর্থিক সহযোগিতায় ফার্ম শুরু করি। শুরুতেই খুব বেগ পেতে হয়েছে, অস্বস্থিবোধ করতাম। কিন্তু এখন অস্বস্থির জায়গায় নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ হয়। সাহেদ জানান, ‘হঠাৎ করে বিগবস গত বছর থেকে বড় হতে লাগলো। আমিও আদর করে নাম দিলাম বিগবস। এখন বন্ধু, পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন সবার কাছে বিগবস এক অনুপ্রেরণাদায়ক নাম।

সাহেদকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এক বছর পূর্বে একই এলাকার ফরহাদ হোসেন ডেইরি ফার্ম গড়ে তুলেন। তিনিও সাহেদের ‘বিগবস’ ষাড় নিয়ে খুব আশাবাদী। ফরহাদ বলেন, সারা দেশের কথা বলতে পারবো না। তবে সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ষাড়টি আমাদের বিগবস। আগামীতে আমাদের খামারেও বিশাল আকারের ষাড় বেড়ে উঠবে।

উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা রঞ্জিত কুমার আচার্য্য বলেন, বিগবস নামের ষাড়ের যে আকার সেটি দেশের বিশাল আকৃতির ষাড়গুলোর মধ্যে অন্যতম। উপজেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর থেকে ফার্মার সাহেদসহ অন্যদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা-পরামর্শ দেয়া হয়। তিনি বলেন, মাথিউরা ইউনিয়নটি মুলত একটি গ্রাম। এ গ্রামের সাহেদের মতো ১০/১৫ জন তরুণ ডেইরি ফার্ম গড়ে তুলেছেন। মুলত তারা দুধ উৎপাদনের জন্য ফার্ম গড়ে তুলতেও তাদের ফার্মে ‘বাই প্রোডাক’ হিসাবে বিশাল আকৃতির ষাড় বেড়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক খাবার দিয়েই গাভী ও ষাড় পালন করছেন খামারি তরুণরা। গরুকে মোটাতাজা করতে খামারিরা কোন ধরনের রাষায়নিক কিংবা স্টেরয়েড জাতীয় ওষধ তারা ব্যবহার করছেন না।