বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক আহমেদ চৌধুরী মারা গেছেন। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয় বলে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মবিন চৌধুরী জানান। ফারুক আহমেদ চৌধুরীর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ছাড়াও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। ফারুক আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
১৯৩৪ সালে সিলেটের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা ফারুক আহমেদ চৌধুরীর বাবা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। ফারুক চৌধুরীদের পৈত্রিক বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। দেশ ভাগের পর ফারুক চৌধুরীদের পৈত্রিক বাড়ি স্থাপিত হয় সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ফারুক চৌধুরীর কূটনৈতিক জীবনের যখন শুরু হয়, পাকিস্তান তখনও একটি নবীন রাষ্ট্র। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ছিলেন প্রথম চিফ অফ প্রটোকল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ইটালি, নেদারল্যান্ডস ও আলজেরিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ডেপুটি হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে পালনের সময় ফারুক চৌধুরী বাংলাদেশের কমনওয়েলথে যোগ দেওয়ার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরপর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এই কূটনীতিক। দেশে ফেরার পর ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন ফারুক চৌধুরী। পরে সরকার তাকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠায় এবং ১৯৯২ সালে অবসরের আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।

চার ভাই দুই বোনের মধ্যে ফারুক চৌধুরী ছিলেন সবার বড়। বাকি তিন ভাইয়ের মধ্যে সাবেক সচিব ইনাম আহমেদ চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। সাবেক রাষ্ট্রদূত ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একসময়। আর সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুম আহমেদ চৌধুরী ২০১২ সালে মারা গেছেন। বোনদের মধ্যে নাসিম হাই শহীদ কর্নেল সৈয়দ আবদুল হাইয়ের স্ত্রী। আর ছোট বোন নীনা আহমেদের স্বামী ফখরুদ্দীন আহমেদ ২০০৭-০৮ সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। তারা আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ফারুক চৌধুরী ও তার স্ত্রী জিনাত চৌধুরীর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলে আদনান চৌধুরী ব্যবসা করেন। মেয়ে ফারজানা আহমেদ থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়।

অবসরের পর ফারুক চৌধুরী বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন ফারুক চৌধুরী।

শমসের মবিন চৌধুরী জানান, বুধবার জোহরের পর ফারুক আহমেদ চৌধুরীর মরদেহ তার এক সময়ের কর্মস্থল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেওয়া হবে। সেখানে একদফা জানাজার পর আসরের পর ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডে বায়তুল আমান জামে মসজিদে আরেক দফা জানাজা হবে। পরে আজিমপুর কবরস্থানে বাংলাদেশের সাবেক এই কূটনীতিককে দাফন করা হবে বলে শমসের মবিন জানান।

সৌজন্যে- দৈনিক ইত্তেফাক