আজকের শিশুরাই আমাদের সোনালী আগামী। তাদেরকে যথাযথভাবে বিকশিত করতে পারলেই স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গঠনের পথ প্রশস্ত হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার জন্য কাব স্কাউটিং কার্যক্রম কে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কীভাবে দলগতভাবে কাজ করতে হবে, দুর্যোগ কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে কি ধরনের আচরণ করতে হবে তা স্কুলে শিখানো একান্ত জরুরি। মোটকথা হলো একজন সুশিক্ষিত, কর্মক্ষম ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে আমাদের সন্তানদের গড়তে হলে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি তাদেরকে কিছু বাড়তি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এ ধরনের কার্যক্রমের মধ্যে উত্তম হলো কাব স্কাউট আন্দোলন।

স্কাউট আন্দোলন বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় স্বেচ্ছাসেবী গতিশীল অরাজনৈতিক আন্দোলন। এটি একটি শিক্ষামূলক কার্যক্রম যা বয়স্ক নেতাদের সমর্থনে পরিবেশিত হয়ে আসছে। শিশু-কিশোর ও যুববয়সীদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সৎ, চরিত্রবান, পরোপকারী, আত্মনির্ভরশীল করে তোলা, আনন্দের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অভ্যস্ত করা সর্বোপরি আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই স্কাউট আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এই ধারাবাহিকতায় শিশুদের প্রাণোচ্ছল, উদ্যমী, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল করার লক্ষ্যে রবার্ট স্টিফেন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল (বিপি) ১৯০৭ সালে ২১ জন বালক নিয়ে ইংল্যান্ডের ব্রাউন্সি দ্বীপে ক্যাম্প আয়োজনের মাধ্যমে স্কাউট আন্দোলনের সূচনা করেন। পরবর্তীতে মেয়েরাও উৎসাহিত হলে ১৯১০ সালে শুরু করেন গার্লস গাইড।

১৯০৭ সালে স্কাউট আন্দোলনের যাত্রা শুরু হলেও বাংলাদেশে এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৭২ সালে।স্কাউট আন্দোলন সব ধরনের ছেলেমেয়েদের জন্য উন্মুক্ত। সুষ্ঠু পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশে স্কাউটিং নিম্নোক্ত তিনটি শাখায় বিভক্ত। শাখাগুলো হলো- ১। কাবস্কাউটস (৬ থেকে ১১ বছর) ২। স্কাউটস (১১ থেকে ১৭ বছর) এবং ৩। রোভার স্কাউটস (১৭ থেকে ২৫ বছর)।

কাব অর্থ শাবক বাচ্চা। স্কাউটিং এ ‘কাব’ অর্থে নেকড়ে বাঘের বাচ্চাদের কথা বুঝানো হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী (৬-১১ বছর বয়সের) বাচ্চাদের এই নামকরণের মধ্য দিয়ে উদ্যমী ও সাহসী করে তোলা হয়।

কাবের মূলমন্ত্র বা আইন হলো: ১। বড়দের কথা মেনে চলা ২। আল্লাহ/ সৃষ্টিকর্তাও দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করা ৩। প্রতিদিন কারো উপকার করা ৪। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব অর্থাৎ কোনো কাজে বিফলতায় মুখ ফেরানো নয়। বার বার চেষ্টা করে সফলতা আনা।

এই আইনগুলো যদি সঠিকভাবে শিশুদের শেখানো হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তারা স্কুল গন্ডির বাইরে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করবে এবং নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।

কাবেরা কাজ শেখে ক্যাম্পিংয়ের মাধ্যমে। নিজেদের কাজ নিজেরা করে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে দলগতভাবে কাজ করে। এর ফলে মিলে মিশে কাজ করা শেখে এবং নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলী অর্জন করে যা পরবর্তী জীবনে তাদেরকে দায়িত্বশীল মানুষ হতে পরিণত করে। শহর অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা শুধু স্কুল আর বাসা পর্যন্ত আসা-যাওয়া করে, বাইরের জগৎ সম্পর্কে তাদের ধারণা কম থাকে। তাদের কায়িক পরিশ্রমও কম হয়। কাবিং কার্যক্রমে বাইরের খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের নিজের কাজ নিজে করা শেখানো হয়। এ কারণে শিশুদের কাবিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

কাবিং এর মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তারা নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারবে। কাবদের নিজস্ব পোশাক থাকে।

কাবিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের আঙ্গুলের বিশেষ কায়দায় সালাম দেয়া ও গ্রহণ করা, ডান হাতে করমর্দন করা ইত্যাদি বিষয় শেখানো হয়। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুরা নিয়মশৃঙ্খলার বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে যা পরবর্তী জীবনে তাদের চিন্তা, কথা ও কাজে নির্মল হতে সাহায্য করে।

শিশুরা আনন্দময় পরিবেশ ভালোবাসে। তারা আনন্দের মাঝে বড় হতে চায়। আনন্দের মাঝে নতুন কিছু শিখতে চায়। কাব স্কাউটিং কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই, সুন্দর আগামী গঠনে প্রতিটি বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রমকে গতিশীল করা উচিৎ।

লেখকঃ সহকারী শিক্ষক, গৌরীনাথ সপ্রাবি ও যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ স্কাউটস বিয়ানীবাজার উপজেলা।

‌অধ্যাপক গোলাম কিবরীয়ার যত অজানা কথা