মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় উপাদিত নানান জাতের লেবুর মধ্যে আদা-লেবু একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে । স্থানীয় ভাবে আদা-জামির পরিচিত এই লেবুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে । সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় এর চাষাবাদ হলেও বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলায় এ জাতীয় লেবুর উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশী। চাহিদার দিক থেকে এই প্রজাতির লেবুর অবস্থান সাতকরার চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেট অঞ্চলের মানুষের খাবারের তালিকায় এটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নিয়েছে আদা-লেবু । মূলত স্বজনদের মাধ্যমে তাঁরা বিদেশে বসেও এ ফলের স্বাদ নিতে পারেন।

মাছ-মাংস, ডালসহ বিভিন্ন রকমের তরিতরকারিতে পরিমাণগত ব্যবহার করা যায়। এতে করে খাবারের স্বাদ ও সুগন্ধ বেড়ে যায়। এছাড়া রোদে শুকিয়ে বেশী দিন রেখে এবং আচার করে পরবর্তীতে রান্নায় ব্যবহার করা যায়। তবে খাবার প্রক্রিয়া না জানায় বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বাইরে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিকট আদা-জামির এখনও অনেকটাই অপরিচিত নাম।

ফল-ফলদ তথা অর্থকরী ফসলের জন্য বিখ্যাত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও জুড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ ফলন হয়ে থাকে। বিশেষ করে টিলাবেষ্টিত কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় আদা-জামিরের ফলন সবচেয়ে বেশী হয়। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি এই দু’টি উপজেলার চা ও আনারস চাষাবাদেও রয়েছে যথেষ্ট সুনাম। বিশেষ করে শীত মৌসুমে, জাম্বুরা, কমলা, সাতকরা, আদা-জামির, শাসনি এসবের ফলন সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাহিদা মেটায় এই মৌসুমি ফল। গাঢ় সবুজ রঙের গোলাকৃতি আদা-জামির প্রকারভেদে ৭০-১০০ টাকা হালি প্রতি বিক্রি হয়ে থাকে। ভরা মৌসুমে আদা-জামির উল্লেখিত দরে বিক্রি হলেও অন্য সময়ে তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।

পাহাড়ি এলাকায় আদা-জামিরের ফলন প্রচুর হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত চাষাবাদের মাধ্যমে এর উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

কমলগঞ্জ উপজেলার পুরানবাড়ী এলাকার লেবু চাষী হারুণ মিয়া বলেন, আগে আমাদের এলাকায় প্রচুর-পরিমাণে আদা-জামিরের চাষাবাদ হতো কালের বিবর্তনে এর ফলন একেবারে কমে গেছে। বিশেষ করে টিলা কাটার ফলে এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস পাওয়ায় চাষাবাদ ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।

তিনি জানান, টিলা কাটা বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বাড়ানোর সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে স্থানীয় চাষিরা এ ফলের চাষাবাদে আগ্রহ দেখাতে পারে।

একই এলাকার বাসিন্দা নিরেন ত্রিপুরা বলেন, ‘আগে আমাদের ত্রিপুরা পল্লীর প্রতিটি বাড়িতে কম-বেশী আদা-জামিরের গাছ ছিল কিন্তু নানা রোগ ব্যাধিতে গাছগুলো মরে কমতে কমতে এখন তা প্রায় শুণ্যের কোঠায়। যে কয়েকটি রয়েছে সেগুলোও বিলুপ্তির পথে।’

বৃক্ষরোপণে নতুন প্রজন্মের আগ্রহের অভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাই যদি এসব ফল-ফলদের চারা লাগাই তবে দেশীয় এ ফলের সু-খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ এবং জাতি।