শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বর্তমান মহাপরিচালকের চাকরির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৭ জানুয়ারি। এ নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গনের চলছে আলোচনা-সমালোচনা। উঠে এসছে পরবর্তী মহাপরিচালকের একটি আলোচিত তালিকা। যদিও এ তালিকার সাথে কে হবেন ডিজি সেটির কোন যোগসূত্র নেই। আলোচিত এ তালিকায় দেশের বিভিন্ন অধ্যাপকের সাথে নাম রয়েছে বিয়ানীবাজারের কৃতি সন্তান সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম গোলাম কীবরিয়া তাপাদার।

বর্তমান ডিজি আগামী জানুয়ারিতে অবসরে যাবেন। প্রায় তিন মাস আগে থেকেই বসে নেই আগ্রহী প্রার্থীরা। শিক্ষাঙ্গনের সর্বত্রই চলছে আলোচনা- কে হচ্ছেন পরবর্তী মহাপরিচালক? এ পদ পেতে এখনই সক্রিয় শিক্ষা ক্যাডারের এক ডজন ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী। আগ্রহীরা কেউ ছাত্রজীবনে রাজনীতির অভিজ্ঞতার প্রমাণ ও পারিবারিক সংশ্লিষ্টতাও তুলে ধরছেন সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে। এখনই ধানমন্ডির কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জোর তদ্বির শুরু করেছেন তারা।

বসে নেই বর্তমান মহাপরিচালকও। এদিকে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহু বছর ধরে নানা উপায়ে বসে থাকার প্রেক্ষাপটে এবার যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এমন শিক্ষকের পদায়নের দাবি উঠেছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দ অনেকেই ইতোমধ্যে সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে মাউশির মহাপরিচালক পদে পদায়নের জন্য যাচাই-বাছাই করে সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা সরকারকে সতর্ক করেছেন, শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে বর্তমান মহাপরিচালকসহ যে ক’জন প্রার্থীর নাম সামনে আসছে তাদের মধ্যে ছাত্রলীগসহ প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন এমন শিক্ষকের সংখ্যা হাতে গোনা দু’একজন। জানা গেছে, বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান আগামী ৭ জানুয়ারি অবসরোত্তর ছুটিতে যাবেন। তবে তিনি আগের সকল মহাপরিচালকের মতোই মেয়াদ বৃদ্ধির চেষ্টা শুরু করেছেন।

সফল হোন বা না হোন মহাপরিচালক চাচ্ছেন শিক্ষা ক্যাডারের আস্থা অর্জন করে সামনে এগোতে। যদিও বিসিএস শিক্ষা সমিতি শিক্ষা প্রশাসনের উর্ধতন পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছে। এছাড়া বর্তমান মহাপরিচালকের মেয়াদ শেষ হলে এ পদে আসার অপেক্ষায় জোর তদ্বির শুরু করেছেন মাউশিরই অন্তত দু’জন প্রভাবশালী অধ্যাপক। যাদের একজন ইতোমধ্যেই সভা সেমিনারে পছন্দের সহকর্মীদের কাছে নিজেকে ‘পরবর্তী ডিজি’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দের একজন ড. কুদ্দুস সিকদার নতুন মহাপরিচালক পদের জন্য নিজেদের আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরে বলছিলেন, আমরা তেমন একজন শিক্ষা ক্যাডারবান্ধব মহাপরিচালক চাই যিনি আমাদের শিক্ষকদের সমস্যা ধারণ করবেন এবং দ্রুত তা সমাধানে উদ্যোগী হবেন। আমরা মনে করি এটা কেবল কোন প্রশাসনিক পদ নয়। মহাপরিচালক যেন শিক্ষকদের সমস্যা ধারণ করেন এবং সমাধানে ত্বরিত পদক্ষেপ নেন। ঢাকা কলেজের এ শিক্ষক প্রসঙ্গত বলেন, শিক্ষক বিশেষত শিক্ষা ক্যাডারে অনেক সমস্যা। যার ফল ভোগ করছেন হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষক। তাই এই সমস্যা ধারণ করার মতো মহাপরিচালক চাই আমরা। কারণ ওই পদে যিনি যান তিনিই প্রশাসক হয়ে যান, শিক্ষকবান্ধব আর থাকেন না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সঙ্গে কথা বলে অন্তত একডজন প্রার্থীর নাম জানা গেছে। যাদের প্রত্যেকেই শিক্ষা সেক্টরের কোন না কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন। বর্তমান মহাপরিচালক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান ছাড়াও মাউশির আরও অন্তত দুজন কর্মকর্তার নাম আলোচনায় এসেছে। যাদের একজন হলেন মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক মোঃ শামসুল হুদা ও পরিচালক (মনিটরিং এ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন) অধ্যাপক ড. সেলিম মিয়া। মহাপরিচালক পদের জন্য জোরেশোরে যাদের নাম সামনে চলে আসছে তাদের মধ্যে আছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোয়াজ্জম হোসেন মোল্লা, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, রাজধানীর বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ইমাম হোসেন, যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আলীম, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউল হক, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক গোলাম কবীর তপাদার, ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শামসুন্নাহার এবং চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহিদা ইসলাম।

নিয়মানুযায়ী, মহাপরিচালক পদে নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এর পরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই পদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে। শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের মধ্য থেকে চাকরির জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মহাপরিচালক নিয়োগের কথা থাকলেও প্রায় ১৫ বছর ধরে রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রভাব, মন্ত্রণালয়সহ সরকারের প্রভাবশালীদের পছন্দই প্রধান্য পেয়েছে। এমপিওভুক্ত প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দেয়া হয় এই অধিদফতর থেকে। এ ছাড়া সরকারী স্কুল ও কলেজের প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীরও যাবতীয় কাজকর্মের দায়িত্ব মাউশির। বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের পদোন্নতি, এমপিওসহ প্রশাসনিক সব কাজই পরিচালিত হয় এ অধিদফতর থেকে। এ ছাড়া শিক্ষার এক ডজনের বেশি প্রকল্পও রয়েছে এই দফতরের অধীনে। অনেক মন্ত্রণালয়ের চেয়েও এই অধিদফতরের কাজের ব্যাপ্তি বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই অধিদফতরের নতুন মহাপরিচালক নিয়ে সবার আগ্রহ থাকে তুঙ্গে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলছিলেন, অনেক অধ্যাপক এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য তালিকায় এলেও তাদের মধ্য থেকেই যে কেউ হবেন এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এখানে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি শিক্ষামন্ত্রীর কাছেও মতামত চাইতে পারেন। তাই বাইরে নতুন কেউ মহাপরিচালকের দায়িত্ব পেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম গোলাম কীবরিয়া তাপাদার বিয়ানীবাজার নিউজ ২৪কে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এ নিয়ে কারো সাথে আলোচনা কিংবা চেষ্টা ও তদবীরে আমি নেই। তিনি বলেন, এরকম কোন তালিকা রয়েছে কি না সেটি বিষয়েও আমি অজ্ঞাত। তবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যেখানে যে দায়িত্ব দেয়া হবে সে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবো।

সূত্র- দৈনিক জনকণ্ঠ, ১০ অক্টোবর ২০১৭।