বড়লেখায় হতদরিদ্রের কর্মসংস্থানে সরকারের গৃহিত কর্মসৃজন প্রকল্পের সুফল পাননি প্রকৃত দরিদ্র লোকজন। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা নামমাত্র শ্রমিক নিয়োজিত করে নির্দিষ্ট মেয়াদের ৩–৪ ভাগের ১ভাগ দিনও কাজ করাননি। কাজ না করে অধিকাংশ নিজেদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়–স্বজন, দোকান কর্মচারী, অটোরিকশা চালককে শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্পের অর্থ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। কেউ কেউ কোনো শ্রমিক দিয়ে কাজ না করেই মাটি কাটার এক্সেভেটর, ট্রাক্টর আর পাওয়ার টিলার দিয়ে সংশ্লিষ্ট রাস্তায় সামান্য মাটি ফেলে ভুয়া শ্রমিক তালিকা জমা দিয়ে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ আত্মসাত করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার গ্রামীণ রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ২০১৬-’১৭ অর্থবছরে ইজিপিপি কর্মসূচির ১ম পর্যায়ে ৪৮ প্রকল্পে ১ কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্নের নির্দেশনা থাকলেও দুর্বল তদারকির কারণে অনেক জনপ্রতিনিধি নামেমাত্র কাজ করিয়ে নয়-ছয় করে প্রকল্পের সিংহভাগ টাকা পকেটস্থ করেছেন। এ কর্মসূচির ১৪নং প্রকল্পে উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউপি’র পূর্ব দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ থেকে বাদেপুকুরিয়া সোলিংয়ের মাথা পর্যন্ত রাস্তা পুনঃনির্মাণে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২৫ জন শ্রমিক ৪০ দিন কাজ করার নিয়ম। প্রত্যেক শ্রমিকের ব্যাংক একাউন্ট খুলে ১০ দিন কাজের পর ১৭৫ টাকা রোজ হিসেবে চেকে স্বাক্ষর করে তারা টাকা উত্তোলন করবে। ২৫ টাকা সঞ্চয় হিসাবে ব্যাংকে জমা থাকবে, যা পরবর্তীতে উত্তোলন করা যাবে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্র জানায়, ইউপি মেম্বার তমছির আলী নিজেকে সভাপতি, আজিজুল হককে সম্পাদক, সালমান আহমদ, আব্দুস সহিদ ও আব্দুল করিমকে সদস্য করে একটি প্রকল্প কমিটি ও ২৫ জন শ্রমিকের তালিকা জমা দেন। সংশ্লিষ্ট অফিস গত ১৩ মার্চ ও ১২ এপ্রিল দুই দাগে বরাদ্দের মোট ২ লাখ টাকা থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ছাড় দেয়। অবশিষ্ট ২৫ হাজার টাকা সঞ্চয় হিসাবে ব্যাংকে জমা থাকে।

ইউপি মেম্বার ও প্রকল্প কমিটির সভাপতি তমছির আলী ২ লাখ টাকার কাজ মাত্র ৩৫ হাজার টাকার চুক্তিতে সমছুল হক, রুহুল আহমদ, বোরহান উদ্দিন, মইনুল হক, আলতা মিয়া, সাব্বির আহমদ ও ওয়াসিম আলী নামক ৮ শ্রমিক দিয়ে করান। তারা ৭–৮ দিন কাজ করে। শ্রমিক ওয়াসিম আলী জানান, ইউপি মেম্বার মাত্র ৮ জন শ্রমিক দিয়ে ৩৫ হাজার টাকার চুক্তিতে এ রাস্তায় কাজ করান। বরাদ্দ কতো টাকা তা তিনি জানেন না। তবে যারা কাজ করেছে তাদের ব্যাংক একাউন্ট করাননি। মেম্বার নগদ টাকা দিয়েছেন। এ কর্মসূচির শুধু ১৪নং প্রকল্পে ২ লাখ টাকার কাজ ৩৫ হাজার টাকায় নয়, অনুসন্ধানে অন্যান্য উপজেলার বেশিরভাগ কর্মসজন প্রকল্পে লুটপাটের একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে জমা তালিকায় উল্লেখিত শ্রমিক মুজমিল আলী, আব্দুল হক, আব্দুস সহিদ, আলফাজ আলী, সুলেমান উদ্দিনসহ ২৫ শ্রমিকই ইউপি মেম্বার তমছির আলীর আত্মীয়–-স্বজন বলে এলাকাবাসী নিশ্চিত করেন। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক ওয়াসিম আলী জানান, তালিকায় থাকা কোনো শ্রমিক এ রাস্তায় একদিনও কাজ করেনি। ২৫ জন আত্মীয়-স্বজনের নামে একাউন্ট খুলে ইউপি মেম্বার চেকে তাদের স্বাক্ষর নিয়ে নিজেই সোনালী ব্যাংক শাহবাজপুর শাখা থেকে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করেন বলে ব্যাংক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে উপজেলার অন্যান্য ৯টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় একইভাবে কাজ না করেই বরাদ্দের টাকা লুটপাট করা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা ভুয়া শ্রমিক তালিকা তৈরি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজাদের রহমানকে একটি নির্দিষ্ট কমিশন দিয়ে বরাদ্দের টাকা লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে ইউপি মেম্বার ও প্রকল্প কমিটির সভাপতি তমছির আলী জানান, ২০০ টাকা রোজে  কোনো শ্রমিক পাওয়া যায় না, তাই চুক্তি করে কাজটি করিয়েছেন। সব জায়গায়ই এভাবে চলছে। পত্রিকায় এসব না লিখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এ কাজে ৩৫ হাজারে নয়, আরও অনেক বেশি টাকা লেগেছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজাদের রহমান জানান, কর্মসৃজন প্রকল্পে অনিয়ম করার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রকল্প কমিটিকে টাকা ফেরত দিতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কমিশন গ্রহণের অভিযোগটি তিনি অস্বীকার করেন।