বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি সংঘর্ষ, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাগবিত-ার ঘটনায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। ২০১২ সালের পর থেকে গত পাঁচ বছরে বিয়ানীবাজার সরকাকরি কলেজে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। কলেজের শ্রেণি কক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৭ জুলাই কলেজের একটি কক্ষে ছাত্রলীগ কর্মী লিটুর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। যা কলেজ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বারের মতো কলেজ ক্যাম্পাস লাশ দেখলো। এছাড়া কলেজের বিবদমান গ্রুপগুলোর সংঘর্ষ কলেজ রোডসহ পৌরশহরে ছড়িয়ে পড়ে- ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এ পাঁচ বছরে বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল কলেজের মধ্যে ৮ বার এবং কলেজ রোডের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দুইবার প্রতিপক্ষের উপর হামলা ও পাল্টা হামলা করেছে। কলেজ রোডের বাটা দোকানে ও গ্রামীন রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে প্রতিপক্ষকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করেছে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা।

এছাড়া সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছয়গ্রুপের বিভক্ত থাকায় তুচ্ছ বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এসব সংঘর্ষে অঙ্গহানির মতো ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। ২০১৫ সালের শেষে দিকে ছাত্রলীগ পাবেল গ্রুপের কর্মীদের লক্ষ্য করে ছাত্রলীগ পল্লব গ্রুপের কর্মীরা শ্রেণি কক্ষে গুলি বর্ষণ করেছিল। এতে দুই শিক্ষার্থী আহত হন। কলেজের বাইরে ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে মূলধারার সাথে রিভারবেল্টের সংঘর্ষে ছাত্রলীগ নেতা আল আমিনের চোখে গুলি লাগলে চিরতরে এক চোখ অন্ধ হয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত এ ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিপক্ষের সাথে সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। আধিপত্য বিস্তারের সাথে আঞ্চলিকতাই এসব সংঘর্ষের মূল কারণ।

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে বিবদমান পক্ষের সংঘর্ষ বিয়ানীবাজারে ছড়িয়ে পড়াটা নতুন ঘটনা নয়। দুই দশক পূর্বেও কলেজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পৌরশহরে সংঘর্ষ ও হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। পুরো বাজারকে সিসি ক্যামেরায় আওতায় নিয়ে আসা না গেলেও কলেজ ক্যাম্পাসকে সহজেই সিসি ক্যামেরায় আওতায় নিয়ে আসা যায়। এতে কলেজকে প্রশাসনকে উদ্যোগী হতে হবে। কলেজের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা থাকলে অপরাধ প্রবণতা অর্ধেক কমে আসবে বলে মত দিয়েছেন উপজেলার শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

শিক্ষাবিদ আলী আহমদ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে লেখা পড়ার জায়গা। এখানে ছাত্র সংগঠন থাকতে পারে। কিন্তু সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে কলেজ প্রশাসনকে মূল দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বলেন, সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হলে অপরাধ প্রবণ হ্রাস পাবে এবং কোন ঘটনা ঘটলে অপরাধী দ্রুত সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা যাবে। প্রশাসনের উচিত হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা।

কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ মজির উদ্দিন আনছার বলেন, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ আমাদের পঞ্চখ- অঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধরে রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। এখানে অধ্যয়ন করতে আসা শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তান। তাদের মঙ্গলের জন্য প্রযুক্তি নির্ভর নিরাপত্তা বেষ্টনি প্রয়োজন। তিনি বলেন, সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে পারলে অপরাধীরা ভয় পাবে। এতে অপরাধ অর্ধেকের বেশি কমে আসবে।

বিয়ানীবাজার স্যোসাল অর্গানাইজেশনের সভাপতি শাহাব উদ্দিন মৌলা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সন্ত্রাস মুক্ত থাকবে, এখানে সুষ্ঠু পরিবেশে শিক্ষাদান করা হবে-এটাই আমরা চাই। কলেজকে সন্ত্রাস মুক্ত করার পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা অতিব জরুরী। এতে কলেজের হৃত গৌরব ফিরে আসবে।
বিয়ানীবাজার জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি শাবুল আহমেদ বলেন, কলেজে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করলে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পাশাপাশি আরও অনেক ধরনের অপরাধ প্রবণতা রোধ হবে। আশাকরি কলেজ প্রশাসন এ বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাববে।

বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান বলেন, শিক্ষার্থীরা কলেজে অরাজকতা সৃষ্টি করে না। বহিরাগতদের কারণে কলেজের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘিœত হয়। তিনি বলেন, কলেজে সিসি ক্যামেরা থাকলে অপরাধীদের অপরাধ প্রবণতা শূন্যেও কোটায় নেমে আসবে। তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর পূর্বে কলেজের শ্রেণি কক্ষে সন্ত্রাসীদের গুলি বর্ষণের ঘটনা নিয়ে উপজেলা সম্মেলন কক্ষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ ও কলেজ প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনে বিষয়টি আসে। আমরা কলেজ অধ্যক্ষকে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার অনুরোধ করেছিলাম। তিনি বলেন, সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে পারলে কলেজের পরিবেশ সুন্দর ও নিরাপদ হবে।

উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিক আহমদ বলেন, সন্ত্রাসী ঘটনায় বিয়ানীবাজার কলেজ বার বার রক্তাক্ত হচ্ছে। এতে মূখ্য ভূমিকা রয়েছে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের। এসব সন্ত্রাসী ঘটনা রুখতে কলেজ প্রশাসনকে নতুন করে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা একটি উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় হতে পারে। এতে সংঘর্ষ ঘটনা রোধ পাবে বলে আমি মনে করি।

বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী বলেন, আগে কি হয়েছিলো জানি না। আমি এখানে আসার পর প্রথম যেদিন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে সেদিনই কলেজে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছি। কলেজ প্রশাসন যত দ্রুত সময়ের মধ্যে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করবে তত এ প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গল হবে। তিনি বলেন, যে কোন ঘটনায় অপরাধী শনাক্ত করতে সিসি ক্যামেরা মূল ভূমিকা রাখবে। এতে অপরাধ কমে আসবে।

বিয়ানীবাজার পৌরসভার মেয়র আব্দুস শুকুর বলেন,কলেজকে সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা সময়ের দাবি। এতে যেকোন ঘটনা শনাক্ত করার পাশাপাশি কলেজের নিরাপত্তা বেষ্টনি জোরদার হবে। সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পাশাপাশি অনেক ধরনের অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পাবে।

বিয়ানীবাজার উপজেরা নির্বাহী কর্মকর্তা মু: আসাদুজ্জামান বলেন, যেকোন অপরাধ শনাক্ত ও রোধ করতে সিসি ক্যামেরা গুরুত্ব অপরীশীম। বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে পারলে অনেক ভাল হয়।  সিসি ক্যামেরা থাকলেও যেকোন ঘটনার রহস্য এবং এর সাথে জড়িতদের শনাক্ত করা খুব সহজ হবে। পাশাপাশি কলেজের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দ্বারকেশ চন্দ্র নাথ বলেন, কলেজের সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি আমরাও চিন্তা করছি। কলেজ প্রশাসনের সভায় এবিষয়টি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আশা করি সকলের মতামত নিয়ে আমরা শীঘ্রই কলেজে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করবো। তিনি বলেন, প্রশাসনিক ভবন ভেঙ্গে ফেলা হবে বলেই আমরা সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি আরও পরে করার ইচ্ছা ছিল। নতুন জায়গায় প্রশাসনিক কার্যালয় স্থানান্তর করা হবে। কিন্তু এসময় আর আমরা অপেক্ষা করব না। এর আগেই সিসি ক্যামেরা স্থাপন করবো।