কনকনে শীত উপেক্ষা করে সাত সকালেই হাওর-বাঁওর, খাল-বিলের ধারে জড়ো হয়েছেন শিকারীরা। এতে দলভুক্ত হতেন এলাকার শিশু-কিশোররাও। মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম পাশে নিয়ে পূর্ব নির্ধারিত সময়ের প্রহর গুনতেন সকলেই। সময় হলেই একযোগে আনন্দ উল্লাসে খাল-বিলে নামার অপেক্ষায় থাকতেন শৌখিন মাছ শিকারী। উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে খাল-বিলের পাড়ে ভিড় জমাতেন উৎসুক জনতা।

শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় এ সময়টাতে দেশীয় প্রজাতির মাছ হাওর-বাওর, খাল-বিলের কম পানিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তখন কম পানিতে পলো দিয়ে মাছ শিকারে আনন্দ পান শৌখিন শিকারী ও কৃষকরা। প্রায় প্রতিবছরই বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া, মাথিউরা ও তিলপাড়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় উদ্যোগে পলো বাওয়া উৎবের আয়োজন হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজার উপজেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার সেই চিরচেনা প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ‘পলো বাওয়া উৎসব’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর পূর্বেও মুড়িয়া ইউনিয়নের বড়বিল, পৌরসভার শ্রীধরা-নবাং এলাকার পাখন বিল, লোলা খাল, মাথিউরার নাদাই খাল, নালবহর খাল, খানিগাঙ, তিলপাড়ার বড়খাল, মাটিজুরা গাঙ, দাসউরা খালে স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে পলো বাওয়া উৎসব হল্রেও এখন এগুলো অনেকটা বিলুপ্তির পথে। তবে এসব বিল-বাদাড়ের কখনো কখনো পলো বাওয়ার আয়োজন করা হলেও তা অতন্ত ছোট্ট পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়। আমেজ কিংবা শৌখিন মাছ শিকারীদের তৎপরতা খুব একটা লক্ষ্য করা যায়না।

বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আলাপ করে জানা যায়, পলো বাও্বয়া উৎসবকে কেন্দ্র করে সকালবেলা এলাকার বিভিন্ন বয়সের শৌখিন শিকারীরা দলবেঁধে পলো নিয়ে খাল-বিলের পানিতে ঝাপ দিতেন। দীর্ঘসময় শীতল জলে মাছ শিকারে মেতে উঠতেন তারা। ঝপ ঝপ শব্দের তালে তালে চলতে থাকতো পলো পাওয়া। শিকারীদের পলোতে ধরা পড়তো বোয়াল, রুই, কাতলা, শোল, গজার, বাউশ, কাতলা ও ব্রিগেডসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ। এছাড়াও জাল দিয়ে ঘোলা জলে উপরে ভেসে উঠা প্রচুর টেংরা-পুঁটিও ধরা হতো। একেকটি মাছ শিকারের সাথে সাথে চিৎকার করে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করতেন শিকারীরা। তাদের ওই আনন্দের সাথে তাল মেলাতেন খাল-বিলের তীরে অপেক্ষমান গ্রামের মুরব্বী, মহিলা ও শিশুরা। দূর থেকে আসা অনেকের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা উপভোগ করতে দেখা যেতো।

প্রবীণরা জানান, এক সময় গ্রাম বাংলার বিভিন্ন জায়গা পলো দিয়ে মাছ ধরার প্রচলন ছিল। কিন্তু এখন আর পলোর বহুল প্রচলন দেখা যায় না। হারিয়ে গেছে মাছ ধরার বিশেষ যন্ত্রটি। বাঁশ দিয়ে সহজে বাড়িতে পলো তৈরি করে অনেকে জীবিকাও নির্বাহ করেন। এখন হাট-বাজারে তেমন আর মেলে না পলো। বর্ষা মৌসুম আসার আগে শুকনো মৌসুমেই এগুলো বিক্রি হতো। তবে আগের মতন আর এগুলোর চাহিদা নেই। দিন দিন পলোর ব্যবহার কমছে। ঐতিহ্যবাহী এ পলোর নাম অনেকে শুনলেও এর দেখা মেলা ভার। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে পলো ও পলো উৎসব।

আজির উদ্দিন নামের এক বৃদ্ধ জানান, আগে মাথিউরার নাদাইখাল ও মাটিজুরা গ্রামের গাঙে পলো বাওয়া উৎসব হতো। পলো নিয়ে মাছ ধরা কোনো প্রতিযোগিতা নয়, একসঙ্গে আনন্দ উৎসবই ছিল তখন মুখ্য বিষয়। মাছ না পেলেও অনেকেই শখের বসে অংশ নিতেন পলো নিয়ে।

এবিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন-

আনন্দ ভ্রমনে সাদা পাথরের দেশে বিয়ানীবাজার কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতি