বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী মক্তব শিক্ষাব্যবস্থা। বিয়ানীবাজারসহ পুরো সিলেটজুড়ে গ্রামীণ মুসলিম পরিবারের শিশুশিক্ষার মূলভিত্তি ছিলো এই মক্তব শিক্ষা। এক সময় এই মক্তব ছিলো মুসলিম পরিবারের শিশুদের জন্য আদব-কায়দা, ধর্মীয় রীতিনীতি, কিংবা ধর্মীয় শিক্ষার একমাত্র ভরসা। তবে মুসলিম পরিবারে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ ধর্মীয় মাসয়ালা-মাসায়েল শেখার অন্যতম ব্যবস্থা ছিলো এটি। ইহকালে শান্তি ও পরকালের নাজাতের শিক্ষার শুরু এই মক্তব থেকেই। এ শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিনরা। তবে এ শিক্ষা ব্যবস্থা এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। কালের আবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে শিশু শিক্ষার এই অন্যতম মাধ্যম। ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়ায় কিন্ডার গার্টেন, ক্যাডেট মাদরাসা, কওমি মাদরাসা ও এতিমখানা, হিফজখানা, কোচিং ব্যবস্থার আড়ালেই হারিয়ে গেছে মক্তব শিক্ষা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিয়ানীবাজার পৌরশহরসহ উপজেলার ১০ ইউনিয়নের প্রায় সবকটি ওয়ার্ডেই এক সময় শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। তবে বর্তমানে এসব মক্তব্য ব্যবস্থার ৪০ শতাংশ ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকার একাধিক প্রবীণ জানান, মক্তব শিক্ষা বিলুপ্তির কারণে আমাদের দেশে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ দিকে শিশুরা ভবিষ্যতে ধর্মীয় জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছে।

তখন মক্তবে শিক্ষকদের মাসিক বেতন ছিল না, বার্ষিক আমন ধান জনপ্রতি পাঁচ থেকে ১০ কেজি করে বেতন হিসেবে দেয়া হতো। কোনো কোনো মক্তবের শিক্ষকরা শুধু ছাত্রদের বাড়িতে খাবার খেয়ে (বেতন ছাড়া) জীবন-যাপন করতেন। যদিও এখনো অনেক এলাকায় মক্তব শিক্ষা চালু রয়েছে, কিন্তু শিক্ষকরা আগের মতো ধান বা বেতন ছাড়া শিক্ষা দেয়ার নিয়ম নীতি নেই। এ শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রী দের কাছ থেকে মাসে জনপ্রতি ৫০/১০০ টাকা পর্যন্ত বেতন হিসেবে নেয়া হয়, যা একেবারেই অপ্রতুল।

এ ব্যাপারে কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়তি হওয়ায় বেতনভাতা না নিলে চলা যায় না। আবার অনেক শিক্ষার্থী গরীব হওয়ায় প্রতিমাসে বেতন ঠিকমতো উঠে না। তবে বেশিরভাগ বিত্তশালী ঘরের সন্তানদের মক্তবে পড়ান না। তাছাড়া মক্তব্যে ছাত্র-ছাত্রীও দিন দিন কমে যাচ্ছে। শুধু মক্তবে শিক্ষকতা করে সংসার পরিচালনা করা আমাদের কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

একাধিক অভিভাবক বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা একসময় মক্তবে পড়ালেখা করেছি। এখন মক্তব শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন ঝিমিয়ে পড়ায় আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষাসহ ধর্মীয় রীতিনীতির জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর বর্তমানে অসচেতনতার কারণে অভিভাবকরা সন্তানদের মক্তবে না পাঠিয়ে বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষা অর্জনের জন্য কোচিংয়ে পাঠিয়ে দেন।

তবে সচেতন মহলের দাবি বাংলা, ইংরেজি, গনিত ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মূলভাণ্ডার মক্তবের প্রতি যেন গুরুত্ব দেন মুসলিম জাতি।

ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি কালের বিবর্তনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন আছিরগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজের প্রভাষক আব্দুস সামাদ আজাদ। তিনি বলেন, মক্তব্য বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় সমাজে অশান্তি, অনাচার, ব্যভিচার এমনকি মিথ্যার বেসারতি আশংকাজনক হারে বাড়ছে। শ্রদ্ধা-সম্মান, স্নেহ-মায়া সমাজ হতে উধাও হতে শুরু করছে।

ব্যক্তি জীবনে ধর্মীয় জ্ঞানের প্রয়োজন সর্বাগ্রে জানিয়ে প্রভাষক আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, মক্তব সিস্টেমকে আমাদের প্রয়োজনেই সমাজে পুনঃ রায় চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও সমজিদ কমিটির সদস্যবৃন্দের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

এবিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন-

হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জাতের ধান