বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবিকা (নার্স) রাবিয়ার সন্ত্রাসী ঘটনায় পুরো উপজেলা জুড়ে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। এক শিশু রোগীকে চিকিৎসা সেবা না দিয়ে উল্টো তার পিতার উপর বাগবিতণ্ডা ও হামলা করেছেন। এরপর এ ঘটনাটি নিজের দিকে নিতে রাবিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। গত বুধবার রাতে এ ঘটনা ঘটে।

তার হামলার শিকার শিশু সাফোয়ানের পিতা বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের উত্তর দুবাগ এলাকার বাসিন্দা শিব্বির আহমদ। জ্বরে আক্রান্ত ১৭ মাস বয়সী সাফোয়ানের চিকিৎসার জন্য বুধবার রাতে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। ডাক্তারের পরামর্শে সাফোয়ানের শরিরে স্যালাইন পুশ করার হয় রক্তক্ষরণ ঘটলে শিব্বিরের সাথে রাবিয়ার বাগবিতণ্ডার জের ধরে এ ঘটনা ঘটে।

সাফোয়ানের সঠিক চিকিৎসার দেয়ার তাগিদ জানানোর অপরাধে পিতা শিব্বির দায়িত্বরত নার্স রাবিয়ার হাতে অপদস্থ হতে হয়েছে। শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হওয়া শিব্বির উল্টো নার্স বাবিয়ার হামলার করার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। বুধবার রাবিয়া তার উপর হামলার করার বিষয়টি জানিয়ে থানায়  লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা যায়, বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে জ্বরে আক্রান্ত ১৭ মাস বয়সী নিজের একমাত্র সন্তান সাফওয়ান আহমদকে নিয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন শিব্বির আহমদ। হাসপাতালে ভর্তির পর তার ছেলেকে দায়িত্বরত স্টাফ নার্স রাবিয়া আক্তার একটি স্যালাইন লাগিয়ে দেন। স্যালাইন দেয়ার কিছুক্ষণ পর সাফওয়ানের হাত থেকে রক্তক্ষরণ হতে থাকলে তিনি নার্স রাবিয়াকে বিষয়টি অবহিত করেন। তখন নার্স রাবিয়া বলেন আমি আসছি আপনি যান। কিন্তু তিনি শিশুটিকে দেখতে যান নি। পরপর দু’বার নার্স রাবিয়ার কাছে গেলে রাবিয়া শিব্বিরের সাথে কড়া ভাষায় কথা বলেন, তিনি তাঁর ঘরের চাকর কিনা এমন প্রশ্ন করেন শিব্বিরকে। এসময় উভয়ের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলে একে অন্যের উপর হামলার চেষ্টা চালালে উপস্থিত লোকজন উভয়কে নিভৃত করেন। এসময় নার্স রাবিয়া শিব্বিরকে দেখা নেয়ার হুমকি দেন। এরপর নিজের সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে শিব্বির পাশর্^বর্তী আয়শা হক হাসপাতালে তাঁর সন্তানকে নিয়ে ভর্তি করেন। এদিকে ঘটনার সময় হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত মেডিকেল অফিসার ডা. মাসুম আহমদকে বিষয়টি না জানিয়ে নার্স রাবিয়া তাঁর স্বামী আহমেদ হাসান সবুজকে জানান। স্ত্রীর ফোন পেয়ে সবুজ দ্রুতগতিতে হাসপাতালে এসে শিব্বিরকে না পেয়ে হাসপাতালের আরএমও ডা. এস এম শাহরিয়ারের চেম্বারে গিয়ে তাঁর সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করে তার উপর হামলা করতে উদ্যত হয়। এসময় নিকটবর্তী ফার্মেসীর লোকজন সবুজকে নিভৃত করেন। এরপর নার্স রাবিয়া দায়িত্বরত পোশাক পরেই ফিল্মি স্টাইলে তার স্বামী সবুজ ও ১৫/২০ জন যুবক নিয়ে আয়শা হক হাসপাতালে গিয়ে শিব্বিরকে হাসপাতাল থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে বেধড়ক মারধর করতে থাকে। শিব্বিরকে বাঁচাতে হাসপাতালের দায়িত্বরতরা এগিয়ে আসলে তাদেরকেও মারধর করে তারা। এসময় শিব্বির ও অন্যান্যদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসলে পালিয়ে যায় নার্স রাবিয়া ও তাঁর বাহিনী। এঘটনায় আহত শিব্বির ওই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছেন।

অপরদিকে এই ঘটনার পর উল্টো আহত শিব্বিরকে অভিযুক্ত করে বিয়ানীবাজার থানায় অভিযোগ দিয়েছে নার্স রাবিয়া আক্তার।

তবে আহত শিব্বিরের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে তিনি বলেন, আমি আহত হওয়ায় আমার ভাই অভিযোগ নিয়ে বিয়ানীবাজার থানায় গেলে আমার অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয় নি। আহত শিব্বির জানান, আমি কি বলবো নিজের সন্তানের জীবন বাঁচাতে এসে এখন নিজের জীবন নিয়েই শংকিত। আমার উপর একজন দায়িত্বশীল নার্স তাঁর বাহিনী নিয়ে এসে যেভাবে হামলা করেছেন তা কোন সভ্য লোকের কাজ হতে পারে না।

তিনি বলেন, বুধবার আমি আমার সন্তানকে নিয়ে ডা. এস এম শাহরিয়ারের কাছে গেলে তিনি ভর্তি হওয়ার জন্য বললে আমি বিয়ানীবাজার সরকারী হাসপাতালে সন্তানকে নিয়ে ভর্তি হই। ভর্তি হওয়ার পর নার্স রাবিয়া আমার বাচ্চার শরিরে একটি স্যালাইন পুশ করে চলে যান। এরপর বাচ্চার হাত দিয়ে রক্ষকরণ হলে আমি বারবার তাকে আসার জন্য বলি কিন্তু তিনি না এসে উল্টো আমার উপর চড়াও হন এবং উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে আমার সন্তানের জীবন বাঁচাতে আমি আয়শা হক হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে আসি কিন্তু এখানে ভর্তি হওয়ার পরই আমার উপর নার্স রাবিয়া তার বাহিনী নিয়ে এসে হামলা করেন।

স্থানীয়রা তাকে বাচিয়েছেন জানিয়ে তিনি জানান, ‘হামলার ঘটনাটি হাসপাতালের আরএমওকে জানানো হয়েছে’।

এ ব্যাপারে নার্স রাবিয়া আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আয়শা হক হাসপাতালে গিয়ে শিব্বিরের উপর হামলার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘সে আমাকে বলেছে পারলে কিছু করার জন্য। তাই আমি ওই হাসপাতালে গিয়েছি, তবে তাকে কে মেরেছে তা আমি জানি না’ এর বেশি তিনি কিছু বলেন নি।

এ বিষয়ে জানতে ঘটনার সময় হাসপাতালে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. মাসুম আহমদের সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমি যেহেতু দায়িত্বপালনরত অবস্থায় আছি কোন সমস্যা হলে নার্স আমাকে জানাবেন কিন্তু তিনি আমাকে বিষয়টি জানান নি।

একই কথা বলেন হাসপাতালের আরএমও ডা. এস এম শাহরিয়ার। তিনি বলেন, আমি চেম্বারে ছিলাম। হঠাৎ এক লোক এসে আমার উপর চড়াও হলে জানতে পারি সে নার্স রাবিয়ার স্বামী। কিন্তু সে যেভাবে কথা বলেছে তা কোন ভদ্র লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এ ঘটনায় নার্স রাবিয়া তাকেও বিষয়টি অবহিত করে নি বলে তিনি জানান।

এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুয়াজ্জিম আলী খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তখন বাহিরে ছিলাম ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানিও না। নার্স রাবিয়াও আমাকে অবহিত করে নি। রাতে বিয়ানীবাজার থানা থেকে একটি ফোন আসে আমার কাছে নার্স রাবিয়ার একটি অভিযোগ বিষয়ে। আমি তাদের বলেছি, যেহেতু বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত নই সেহেতু আমি কিছু বলতে পারবো না। এই ঘটনায় আয়শা হক হাসপাতাল কিংবা শিব্বিরের পক্ষ থেকেও তাকে কোন অভিযোগ দেয়া হয় নি বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে আয়শা হক হাসপাতালের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম মানিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান- আমাদের হাসপাতালে ও রোগীর উপর নার্স রাবেয়া ও তার বাহিনীর হামলার বিষয়টি বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. এস এম শাহরিয়ারকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফয়েজ আহমদকেও অবহিত করা হয়েছে। এখন তিনি সিদ্ধান্ত নিবেন কি করবেন না করবেন। তবে আমরাও চাই এরকম ঘটনা যাতে আর না ঘটে।

বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। ডাক্তারদের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করে তারপর ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, শিব্বির আহমদের কোন অভিযোগ আমরা পাইনি।