উপজেলার কুড়ারাবাজর ইউনিয়নের খশির নোয়াপাড়া এলাকার বচন মিয়া গা শিওরে উঠার মতো বন্যার দুর্ভোগের বর্ণনা দেন। গত সোমবার বিষাক্ত সাপের সাথে এক সঙ্গে একই খাটে রাত কাটিয়েছেন তিনি। গত রবিবার ঘর দুই ফুট পানিতে তলিয়ে গেলে পরিবারের শিশু ও নারী সদস্যদের আত্মীয়দের বাড়ি পাঠিয়ে নিজে একা বাড়িতে থাকেন। উদ্দেশ্যে ছিচকে চোরদের হাত থেকে বাড়ি রক্ষা করা। বচন মিয়া জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে বিছানায় ঘুমতে জান। বিছানা শুয়ে উপরে চোখ যেতেই তিনি শিউরে উঠি। আতংকে শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে যায়। খাটের স্টেন্ডের সাথে একটি কালো ‘আলদ’ সাপ পেঁচ দিয়ে ঝুলে রয়েছে। সাপের সাথে তার অল্প দুরত্ব। এ অবস্থায় সারা রাত জেগে কাটিয়ে দেন। ভয়ে বিছানা থেকে এক চুলও নড়েননি। ভোর হতেই সাপ খাটের স্টেন্ড থেকে নেমে বেরিয়ে যায়।

বিয়ানীবাজারের যে দিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। নদী, গ্রাম, রাস্তা-ঘাট সব একাকার হয়ে গেছে। বন্যা কবলিত এলাকার বাড়ি-ঘর যেন একেকটি দ্বীপ। প্রধান সড়কসহ গ্রামীন সড়ক তলিয়ে যাওয়া বন্যার্থদের যোগযোগ বাহন বলতে একমাত্র নৌকা। যাদের নৌকা নেই তারা রয়েছেন চরম বিপাকে।

কুশিয়ারায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিয়ানীবাজার উপজেলার ৭ ইউনিয়ন ও পৌরসভা তলিয়ে গেছে। বাড়ি-ঘর ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ। শুধুমাত্র কুড়ারবাজার ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে খশির নোয়াপাড়া, রামনগর, খশির চালত, কোনাপাড়া, নোয়া বাড়ি, আব্দুল্লাহপুর ও ভেউলোপাড়া এলাকার বাড়ি-ঘর ডুবে যাওয়া প্রায় তিন শতাধিক পরিবার পানি বন্ধি হয়ে পড়েছেন। একই বিছানায় রান্নাবান্না ও থাকা-খাওয়া সারছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা।
ইউনিয়নের রামনগর এলাকার গৃহিনী সামছুন্নাহার বলেন, গত নয় দিন থেকে খাটের উপর অস্থায়ী চুলা দিয়ে রান্না-বান্নার কাজ সারতে হচ্ছে। ঘর-বাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে জ¦ানালি সংকট দেখা দিয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় কাজ সারতে তারা হীমশীম খাচ্ছেন। সামছুন্নাহারের স্বামী ও ছেলে প্রবাসে রয়েছেন জানিয়ে বলেন, অন্য-ছেলে মেয়েদের আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। ছেলে সোহানকে সাথে নিয়ে তিনি বাড়িতে থাকছেন। রাত নেমে এলে বিষাক্ত সাপের ভয়ের সাথে অনেক অজানা ভয় তাকে ঘিরে ধরে।
কুড়ারাবাজার ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মতো পানি বন্ধি রয়েছেন ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু তাহের বলেন, ইউনিয়নের তিন ওয়ার্ডে বন্যা কবলিতদের জন্য চাল বরাদ্ধ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার থেকে বন্যার্থদের মধ্যে দশ কেজি করে চাল বিতরণ করছেন। বন্যার্থরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। বচন মিয়ার মতো অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিষাক্ত সাপের সাথে এক ঘরে রাত কাটিয়েছেন।

কুশিয়ারা নদীর গা ঘেঁষে কুড়ারবাজার, শেওলা ও দুবাগ ইউনিয়ন। গত মঙ্গলবার নদীর শেওলা পয়েন্টে বিপৎসীমার দশমিক ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। কুশিয়ারার তীরবর্তী এ তিনি ইউনিয়নের মতো দুর্ভোগ পড়েছেন সোনাই নদীর তীরবর্তী মুড়িয়া, লাউতা ও তিলপাড়া ইউনিয়ন। এ পর্যন্ত উপজেলার পাঁচটি আশ্রয় কেন্দ্রে ১০২ পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয় কেন্দ্রে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। ভাইরাস জ¦র ও নিউমোনিয়ায় নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ১৭জনকে চিকিৎসা দিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভ্রাম্যমান মেডিকেল টিম।

খশির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে ৩০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে ভাইরাস জ¦রে আক্রান্ত আব্দুল করিম ময়নাকে (৫৩) চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ প্রদান শেষে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডকিল অফিসার মাসুম আহমদ বলেন, আমির উদ্দিন (৪৫) ভাইসার জ¦র এবং তার শিশু কন্যা (৭)কে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ঔষধ দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত তাদেও ১৬টি ভ্রাম্যমান মেডিকেল টিম ১৭ রোগীদের সেবা প্রদান করেছেন।

খশির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জ¦র নিয়ে গত রবিবার আশ্রয় নেন নোয়া পাড়ার আব্দুর রহিম তোতা। সোমবার দুপুরের দিকে তিনি আশ্রয় কেন্দ্রে মারা যান বলে জানান কুড়ারবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের। তিনি দুইহাজার এবং আওয়ামী লীগ নেতা তুতিউর রহমান তোতা কাফনের কাপড় দিয়েছেন।

সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের চারটি অংশ ডুবে যাওয়ায় সিলেটের সাথে বিয়ানীবাজারের সরাসরি যোগযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে। একই অবস্থা সিলেটের সাথে বিকল্প সড়ক যোগাযোগ বিয়ানীবাজার-চন্দরপুর সড়কের। এ সড়কের আশিভাগ অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গত এক সপ্তাহ থেকে সড়ক দিয়ে কোন যান চলাচল করছে না। গ্রামীণ সড়ক গুলো হাটু তেকে কমর পানি পাড়ি দিতে হচ্ছে বন্যা কবলিত এলাকার বাসিন্দাদের।

বন্যায় উপজেলার ৪৫ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩টি মাদ্রাসা ও ৬টি কেজি স্কুল তলিয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে থেকে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছেন কর্তৃপক্ষ। তলিয়ে গেছে বৈরাগীবাজার, দুবাগ ও শানেশ^র এলাকার গ্রামীন হাট-বাজারগুলো।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গত মঙ্গলবার থেকে বিয়ানীবাজার উপজেলার বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ পর্যন্ত উপজেলা বন্যা দুর্গত এলাকায় সাড়ে ১৪ টন জিআর চাল বিতরণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। শিক্ষামন্ত্রীর নিদের্শে বন্যা দুর্গত এলাকায় আরও ত্রাণ আসছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মু: আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর নিদের্শে বিয়ানীবাজার উপজেলার বন্যা দুর্গত এলাকার জন্য ত্রাণ বরাদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। শীঘ্রই এসব ত্রাণ এসে পৌছাবে।