১৯৭১ সালের ১৩ জুলাই রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা বিয়ানীবাজার উপজেলার বৈরাগীবাজারের সড়কভাংনির খশির গ্রামের জামালকে খুঁজতে গ্রামে অভিযান চালায়। সেনা অভিযান থেকে বাঁচতে তিনি নানাশ্বশুড়ের বাড়ি বৈরাগীর জয়নগর উছাবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। ১৪ জুলাই ভোরে ভারত চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বাবা। বাড়ি থেকে মা ও স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন। খাসা দীঘিরপাড় এলাকায় যাওয়ার পর রাজাকার ফুরকান মাস্টার এক চৌকিদারের সহযোগিতায় তাকে আটক করে খাসা মসজিদে আটকে রাখে। সেখান থেকে খাসা দীঘিরপাড়ে রাজাকার আবদুল খালিকের বাড়ির সামনে নিয়ে যাওয়া তাকে।

জামালকে আটকের খবর শুনে তার মা সেখানে ছুটে যান। জামালকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন চালাচ্ছে রাজাকার ফুরকান মাস্টার- এ দৃশ্য দেখে তার দুই পা জড়িয়ে ছেলের প্রাণভিক্ষা চান তার মা। ফুরকান মাস্টার তাকে লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। অনেক অনুনয়-বিনয় করেও ছেলেকে ছাড়াতে পারেননি মা। ফুরকান মাস্টার অন্য রাজাকারদের সহযোগিতায় জামাল ও ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামের মনোহর আলীকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। সেখানে রাতভর নির্যাতন চলে তার ওপর। পরদিন ১৫ জুলাই জামালকে বিয়ানীবাজার থানার পেছনে কাঁঠালতলায় নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পাক সেনাদের হাতে এভাবে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়া জামাল পাননি শহীদের স্বীকৃতি। জীবদ্দশায় ছেলের শহীদ হওয়ার স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেননি তার মা আয়েশা বেগম ও স্ত্রী নেহারুন নেছা। এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। স্থানীয়ভাবে শহীদ জামাল স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ জামাল স্মৃতি সংসদ গড়ে উঠলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনসহ সব জায়গায় শহীদ পিতার স্বীকৃতি পেতে আবেদন করলেও তা পাননি শহীদ জামালের একমাত্র কন্যা স্বাধীন সুন্দরী। ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যা সন্তানের জননী স্বাধীন সুন্দরীর একটাই কামনা, মরার আগে শহীদ পিতার স্বীকৃতি চান।

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রায় সবকটি বধ্যভূমি, গণকবর, টর্চারসেলকে ঘিরে গড়ে উঠা স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনারে সবাই শ্রদ্ধা জানালেও শহীদ জামালের স্মৃতিস্তম্বে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পিত হয়নি। সবাই ভুলে গেলেও স্বীকৃতি না পাওয়া শহীদ জামালের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে ভুলে যাননি তার মেয়ে স্বাধীন সুন্দরী। বৈরাগীর ত্রিমুখীতে স্থাপিত শহীদ জামালের স্মৃতিস্তম্ভ পান-সিগারেট কিংবা ভ্রাম্যমান দোকানের আড়ালে অনেকটা হারিয়ে গেলেও বুধবার সকালে শহীদ পিতার সেই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন স্বাধীন সুন্দরী। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বৈরাগীবাজারের পল্লীবাউল সংগীতালয়ের নেতৃবৃন্দরা।

শ্রদ্ধা নিবেদনকালে তার সাথে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্বা সত্তার আলী, বৈরাগীবাজারের পল্লীবাউল সংগীতালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এম এস মানিক,  শিক্ষক এনামুল কবির, সমাজসেবী আতিকুল ইসলাম, সামছুল আলম, জাহাঙ্গীর মুক্তিযদ্ধার সন্তান হারুনুর রশিদ, নজরুল ইসলাম, পল্লীবাউল সংগীতালয় একাডেমীর সদস্য খালেদ আহমদ, জায়দুল হক, আলী নুর, নুরুল হক, সাদাত হোসেন সহকারী প্রমুখ।