একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর চলমান করোনা মহামারীই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্যোগ, সংকটের ঘটনা। নতুন প্রজন্ম একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের পাক বাহিনীর বর্বরতা না দেখলেও করোনাকালের ভয়াবহতা দেখছে। ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে দেশে করোনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়। রোগী দ্রুত বাড়তে থাকে দেশের জেলা-উপজেলায়। করোনার এমন ভয়াবহতা থেকে বাদ যায়নি সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজার উপজেলাও। গত বছর ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু করে চলতি বছরের ৮ জুলাই পর্যন্ত ৬৩৮জনের শরীরে করোনাভাইরাসের অস্বিত্ব শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪জন আক্রান্ত রোগী। করোনা সংক্রমণ চলাকালে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিয়ানীবাজারসহ আশপাশ এলাকার মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এই জনপদেরই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

করোনাকালে সেইসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ‘বীরত্বগাঁথা’র চিত্র ফুটিয়ে তুলতে ‘বিয়ানীবাজার নিউজ২৪ ডটকম’ তৈরি করেছে ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম পর্বে রয়েছে বিয়ানীবাজারের ‘প্রতিশ্রুতি’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সদস্যদের গল্প।

‘লাশের কথা জানিয়ে মুঠোফোনে মেসেজ পাওয়ার পর থেকে শুরু হয় কাজ। লাশের গোসল থেকে শুরু করে দাফনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আমরা যখন ঘরে ফিরি, তখন নিজেরাই বুঝতে পারি না জীবিত আছি কি না। সুরক্ষা পোশাক পিপিই, হাতে গ্লাভস, চোখে চশমাসহ পুরো পোশাক পরে গরমের মধ্যে কাজ করা যে কতটা কষ্টসাধ্য, তা বলে বোঝানো যাবে না। দমবন্ধ হয়ে আসে একেক সময়। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে বাড়িতে আসলেও কবরস্থানে কবর দেওয়া পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় মৃত ব্যক্তিদের স্বজনরাও কাছে আসেন না ভয়ে। তবে আমরা ভয় পাই না। এই মৃত ব্যক্তিরা তো আমাদেরই কারও না কারও স্বজন।’

কোভিড ১৯–এ (করোনাভাইরাস) আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের রায়গড় এলাকার এক নারীর মরদেহ দাফনকার্য শেষ করার পর মুঠোফোনে কথাগুলো বললেন ২৮ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবী সৈয়দ খালেদ আহমদ। তিনি বিয়ানীবাজার থেকে পরিচালিত পূর্ব সিলেটের অন্যতম বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিশ্রুতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কিভাবে মৃত ব্যক্তির স্বজনরা তাঁদের সন্ধান পান- শুরুতেই এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ খালেদ আহমদ জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনাস্টিক সেন্টারের ফটক ও দেয়াল এবং যানবাহনে লাগানো প্রতিশ্রুতির প্রচারপত্রের মাধ্যমে। সেখানে স্বেচ্ছাসেবীদের কয়েকটি হটলাইন মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ করা আছে।

অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সৈয়দ খালেদ আহমদ বললেন, আমরা ইতোমধ্যে সিলেট শহরসহ বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জ উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৩৬জন নারী-পুরুষদের দাফন ও সৎকার করেছি। তাছাড়া আমাদের সংগঠনের সদস্যরা বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী দলের সদস্য হয়েও করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফন ও সৎকার করতে সহযোগিতা করেছে। তিনি বলেন, মৃতদের পরিবারের সদস্যরা ভয় পেলেও লাশ দাফন কিংবা সৎকারে তাঁরা ভয় পাচ্ছেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সরকারের নির্দেশনা মেনে নিজেরা সুরক্ষিত থেকে  এ কাজ করে আসছেন তারা এবং এখন পর্যন্ত তাঁদের দুইজন সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

সৈয়দ খালেদ আহমদ আরও জানান, সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিশ্রুতির ৫০জন স্বেচ্ছাসেবী রয়েছে যারা শুধুমাত্র করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফন সৎকার কাজে সহায়তা করেন। এই দলে নারী সদস্যরাও রয়েছেন। তিনি জানান, স্বেচ্চাসেবীদের সুরক্ষায় সরঞ্জামাদি দিয়ে এখন পর্যন্ত লতিফ ট্র্যাভেলসের সত্ত্বাধিকারী জহিরুল ইসলাম শিরু, যুক্তরাজ্যভিত্তিক চ্যারিটি সংগঠন ইএইচএন এবং সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. জেদান আল মুসা সহযোগিতা করেছেন।

কথা হয় প্রতিশ্রুতির স্বেচ্ছাসেবী দলের সদস্য ফরহাদ, শামীম, রুমেল, জয়, দিপু, তায়েফ, সাজু, জামরুল, শফি, জান্নাত আরা ও মান্নাসহ কয়েকজনের সাথে। আলাপকালে তারা জানান, ধর্মীয় বিধান মেনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করে যাচ্ছেন তারা। মুসলিম ছাড়াও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্যও তারা কাজ করেন। শুরু থেকেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে দাফন বা সৎকার করছে প্রতিশ্রুতি।

প্রতিশ্রুতি মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। প্রথমদিকে অসহায় ও মুমুর্ষু রোগীদের বিনামূল্যে রক্তদান ও রক্ত সরবরাহ এবং রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দেয়ার কাজ করতো এই সংগঠনের সদস্যরা। পরবর্তীতে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তারা অংশগ্রহণ শুরু করে এবং দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে তাঁরা করোনায় মৃতদের দাফন ও সৎকার কাজ করে আসছে। এসব স্বেচ্ছাসেবীদের কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকুরিজীবী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউবা আবার শিক্ষার্থী। বয়সে যুবা এসব স্বেচ্ছাসেবীরা দিনে বা রাতে যেকোনো সময়ে ডাক পড়লেই তারা হাজির হয়ে যান মৃতের বাসাবাড়িতে। যথাযথ ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী মমতা নিয়ে মৃতের আপনজন হয়ে শেষ বিদায় জানান তারা। একটি দাফন বা সৎকার শেষে নিরাপত্তার স্বার্থে কর্মীদের পরিধেয় পোশাকসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কবরস্থানে বা শ্মশানে তাৎক্ষণিক পুড়িয়ে ফেলা হয়।

সংশ্লিষ্টরা একটি দাফন বা সৎকার কাজে সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করেন বেশ কয়েক ধরনের জীবাণুনাশক রাসায়নিক পদার্থ। পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় পিপিই, মাস্ক, সেফটি গ্লাস, ফেসশিল্ড, সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভস, হেভি গ্লাভস, নেক কভার, মরদেহের কাফনের কাপড়, মরদেহ বহনের জন্য বিশেষ বডিব্যাগ ইত্যাদি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী পরিচালিত এ দাফন কার্যক্রম পুরোটাই চলছে প্রতিশ্রুতি পরিবারের সদস্যদের চাঁদা সংগ্রহের ভিত্তিতে।

মসজিদের শহর বিয়ানীবাজার ।। পর্ব-১৬