এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ হয়েছে ১১ বার। চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ৫টি দেশ। কিন্তু প্রথম আসর থেকে খেললেও ইংল্যান্ড এখনও বিশ্বকাপ জেতেনি। প্রথম তিনটি সহ মোট চারটিতে তারা আয়োজক ছিল। নিজের দেশের একটিসহ মোট তিনটিতে ফাইনালও খেলেছে। কিন্তু পরে এসে শ্রীলংকা জিতলেও বিশ্বকাপ শিরোপা প্রতিবার অধরাই রয়ে গেছে ইংলিশদের। একের পর এক হতাশার গল্প লেখা সেই ইংল্যান্ডকেই এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দাবিদার মনে করছেন বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বিশ্নেষক, সংগঠক- প্রায় সবাই।

ইংল্যান্ডকে ফেভারিট তালিকার এক নম্বরে রেখে দুই এবং তিনের জন্য উচ্চারিত হচ্ছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার নাম। এ তিনটি দলের সেমি নিশ্চিত ধরে নিলেও সেরা চারের লড়াইয়ে থাকবে আরও একটি দল। আর সেমিতে ওঠা যে কোনো দলেরই টানা দুই ম্যাচ ভালো খেলে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব। ফেভারিট হিসেবে তাই পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, উইন্ডিজ আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেউ উড়িয়ে দিচ্ছে না। তবে আলোচনার টেবিলে ঘুরেফিরে ওই ইংল্যান্ডের নামটাই সবার ওপরে। সব দলই যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুসারে খেলতে পারে, তাহলে ইংল্যান্ড একপ্রকার হেসেখেলেই বিশ্বকাপ জিতে যাবে বলে ধারণা বোদ্ধাদের।

কখনও বিশ্বকাপ না জেতা ইংল্যান্ডকে নিয়ে এবার মাতামাতি হচ্ছে নানাবিধ কারণে। নিজেদের চেনা মাঠ, দর্শক সমর্থন অবশ্যই একটি কারণ। তবে স্বাগতিক হওয়াই যে যথেষ্ট নয়, তা আগের চারবারেই প্রমাণিত, শেষবার তো প্রথম রাউন্ড থেকেই ছিটকে পড়তে হয়েছে। অন্যরা পিছিয়ে, ইংল্যান্ডই কেন সবার চেয়ে এগিয়ে- এমন প্রশ্নে অন্তত ডজনখানেক যুক্তি-পরিসংখ্যান আছে ইংল্যান্ডের পক্ষে।

সর্বশেষ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব না উতরানো দলটি গত চার বছরে হয়ে উঠেছে অন্য এক দল। আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল এখন ইংল্যান্ড। গত দুই বছরে ৫৬ ম্যাচের ৪১টিতেই জয় তাদের, চার বছরে ৮১-তে ৫৮; শতাংশের হিসেবে ৭০.৭। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারতের যেখানে ৬৫.৯। ইয়ন মরগানের দল গত বিশ্বকাপের পর থেকে এ বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত ওয়ানডে খেলার ধরনকেও দিয়েছে নতুন মাত্রা। দুই বিশ্বকাপের মাঝে কেবল এ দলটিই ওভারপ্রতি গড়ে ৬-এর বেশি (৬.২৯) রান তুলতে পেরেছে।

রান দৌড়ে পরের অবস্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়া তুলনায় অনেক পিছিয়ে, ৫.৭২। দ্রুত রান তোলার ফলে বড় ইনিংসও হয়েছে বেশি। যে ইংল্যান্ড ২০১৫ পর্যন্ত একবারও চারশ’ রানের ঘরে পৌঁছতে পারেনি, সে দলটি গত চার বছরেই চারশ’ পেরিয়েছে চারবার। অথচ এ সময়ে সব দল মিলিয়েই চারশ’+ ইনিংস মাত্র পাঁচটি! এর মধ্যে দু’বার সর্বোচ্চ বিশ্বরেকর্ডও ভেঙেছে ইংল্যান্ড। এখনকার ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল ওপেনিং জুটি ইংল্যান্ডের জেসন রয়-জনি বেয়ারস্টোর ( ৫৮.৭), দুই ওপেনারের সঙ্গে জস বাটলার আছেন ওয়ানডে ইতিহাসের (কমপক্ষে এক হাজার রান) সেরা স্ট্রাইক রেটের সেরা দশের মধ্যে। এ ছাড়া ব্যাটিং লাইনআপের পাঁচজনের অবস্থানই র‌্যাংকিংয়ের সেরা বিশের মধ্যে। কেবল ব্যাটিং নয়, বোলিং আর অলরাউন্ডার পজিশনেও আছে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার। গত চার বছরে সবচেয়ে বেশি ১২৯ উইকেটশিকারি বোলার আদিল রশিদ। এ সময়ে ক্রিকেটের সেরা দুই পেস বোলিং অলরাউন্ডারও এ দলের বেন স্টোকস ও জোফরা আর্চার। এমন দুর্দান্ত একটি দলই তো বিশ্বকাপের বড় দাবিদার হবে। তবে সেরা দল মানে বিশ্বকাপ জেতার নিশ্চয়তাও নয়।

সাফল্যের অনুপাতে ২০১১-১৪ সময়ের সেরা দল ছিল ভারত, ট্রফি জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া, ২০০৭-১০ সময়ের সেরা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, কিন্তু বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারত। ঠিক এই সম্ভাবনার কারণেই ইংল্যান্ড ছাড়াও বিশ্বকাপের দাবিদার আছে। এক্ষেত্রে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াই এগিয়ে বেশি। ডেভিড ওয়ার্নার আর স্টিভেন স্মিথকে ছাড়াই সর্বশেষ দুটি সিরিজে টানা আট ম্যাচ জিতেছে অ্যারন ফিঞ্চের দল।

বিশ্বকাপে ওয়ার্নার-স্মিথের পাশাপাশি চোট কাটিয়ে ফিরছেন দুই গতি তারকা মিচেল স্টার্ক ও প্যাট কামিন্সও। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের তাই সম্ভাব্য শিরোপাজয়ী ধরতেই হয়। এ ছাড়া আছে বিরাট কোহলির ভারত। রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ানের ওপেনিং জুটির পর কোহলি, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের নিয়ে গড়া ব্যাটিং লাইনআপ যথেষ্টই শক্তিশালী।

এছাড়া জাসপ্রিত বুমরাহ, মোহাম্মদ শামি, ভুবনেশ্বর কুমারের মতো পেসার আর যুজবেন্দ্র চাহাল, কেদার যাদবদের মতো রিস্ট স্পিনার মিলিয়ে ভারতের বোলিং লাইনআপও এ মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা। শিরোপা দৌড়ে থাকা বাকিদের মধ্যে ধরা হচ্ছে দুই বছর আগে ইংল্যান্ডের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতা পাকিস্তান, একাধিক বড় শট খেলা ব্যাটসম্যানে সমৃদ্ধ উইন্ডিজ, বোলিং শক্তির দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্যালান্সড টিম নিউজিল্যান্ডকে।

বিশ্বকাপে ভালো খেলার অভিজ্ঞতার কারণে শ্রীলংকা, ওয়ানডের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ধারাবাহিক দল বাংলাদেশকেও সেমির দল মনে করছেন অনেকে। তবে কোনো না কোনো ক্যাটাগরিতে ভিন্ন ভিন্ন দল এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপজয়ের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রসদ আছে কেবল ইংলিশদেরই। ফেভারিটও তারাই।