ইউরোপ-আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে, তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় সাফল্য। প্রতিদিন একেকটি সাফল্যের খবর সংবাদপত্র ও ফেসবুকের কল্যাণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে বিদেশে সকলকে আনন্দিত করছে। পুরো কমিউনিটির মুখ উজ্জ্বল করছে। বাড়ছে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রত্যয়। উন্নত বিশ্বের সামাজিক বাস্তবতায় সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে যা প্রতিটি বাঙালি পরিবারে সঞ্চারণ করছে আশার আলো।

হ্যাঁ, নিউ ইয়র্কে উচ্চ শিক্ষায় আমাদের বাংলাদেশী কমিউনিটির সাফল্য তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বহুগুনে অগ্রগামী। এখানকার উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে দ্রুত উর্ধ্বগামী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। পিতা-মাতাগণ এদেশে এসে নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করছেন, কিন্তুু সন্তানের শিক্ষার বিষয়ে প্রায় সকলেই সজাগ। সকলেই চান তাদের সন্তানরা তাদের চেয়ে ভালো ক্যারিয়ার গড়ুক। প্রতিটি বাঙালি পরিবার একই মানসিকতায় উজ্জ্বল। তাই প্রতিটি পরিবারে লেগেছে উচ্চ শিক্ষার ছোঁয়া ও সাফল্য।

একটি গল্প বলি। একজন বাংলাদেশী টেক্সিচালক গাড়িতে তিনজন আমেরিকানকে নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে লং আইল্যান্ডে গেলেন। যাত্রা পথে বিভিন্ন কারণে তিনি অনুভব করলেন যে, তার প্যাসেঞ্জারগণ বৈষম্যবাদী এবং তারা স্বয়ং তার বিষয়েই ইংরেজীতে নানারকম ন্যাক্ষারজনক মন্তব্য করছেন। তিনি চিন্তা করলেন, কিভাবে তাদের একটুও না হয় শিক্ষা দেবেন। চেষ্টা করে তিনি নিজের ও বাঙালী কমিউনিটির গৌরবের ক্ষেত্রটি খুজে বের করলেন। অবশেষে গন্তব্যে পৌছে প্যাসেঞ্জারগন টেক্সি থেকে নামার সময় যখন তারা তাকে ভাড়া দিতে গেলো তখন তিনি তাদেরকে নির্ধারিত ভাড়ার অংকটা বলে তা থেকে দশ ডলার কম দিতে বললেন। প্যাসেঞ্জারগণ তীর্যক দৃষ্টিতে বললো, কেন? এদেশের মানুষ কিন্তু অহেতুক বদান্যতা পছন্দ করেনা ।

তিনি বললেন, আমার একটি ছেলে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ে এবং একটি মেয়ে বায়োটেকনোলজি পড়ে, তাদের মাষ্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছে, এ উপলক্ষে আমি প্যাসেঞ্জারদের কাছ থেকে কম ভাড়া নিয়ে তাদের পক্ষ থেকে আমার সন্তানদের জন্য দোয়া চাই, যেন তারা সুস্থ্যভাবে পরীক্ষা দিতে পারে। এবার প্যাসোঞ্জারগণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোমার সন্তান ক’জন ? পশ্চিমারা ব্যাপকাংশ বাঙালিদের চার-পাঁচজন সন্তান থাকার বিষয়েই বেশী বিশ্বাসী। এ বিষয়ে তারা অনেক সময় ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে। তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, পাঁচ জন। পাঁচজন সন্তানের কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই তারা বিরক্ত হলো। কারণ, আমেরিকানরা বেশী সন্তানাদি পছন্দ করেনা। তারা জিজ্ঞাসা করলো, বাকি তিনজন কি করে? তিনি বললেন, আগামী বছর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একজনের মাষ্টার্স সম্পন্ন করবে, একজন নিউ ইয়র্কের জন জে কলেজে ক্রিমিনাল জাষ্টিসের উপর গ্রেজ্যুয়েশনে পড়ছে দু’বছর হলো, আর শেষজন আগামী বছর ব্রুকলিন টেক (ব্রুকলিন টেকনিক্যাল হাইস্কুল আমেরিকার অন্যতম প্রসিদ্ধ হাই স্কুল) থেকে হাইস্কুল গ্রেজ্যুয়েশন শেষ করবে। আমেরিকানরা তাদের ড্রাইভারের মুখে তার সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় অগ্রগামীতার কথা শুনে অবাক হয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাঁকিয়ে নিলো। বললো, হোয়াও, ইটস লাইক এ ড্রিম। বিস্ময়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো, হোয়াট ইজ ইউর এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড? তিনি বললেন যে, তিনি বাংলাদেশ থেকে হাইস্কুল পাস করে এসেছেন। এবার তারা আরেকটু বেশীই যেন অবাক হলো। তারা বিস্ময়াভিভূত চোখে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা বেশী অবাক হলাম এজন্য যে, তুমি নিজে মাত্র হাইস্কুল পাস করেছো, কিন্তু, তোমার সন্তানদের যেভাবে উচ্চ শিক্ষা দিচ্ছো তা আমাদের আমেরিকানদের বেলায়ও সম্ভব হচ্ছেনা। আমরা আমাদের সন্তানদের ঠিক এভাবে গড়ে তুলতে পারছিনা। তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

এবার তিনি একটু আনন্দিত হয়ে তাদের বললেন, জানো, আমাদের কমিউনিটির প্রতিটি ঘরে একই অবস্থা, আমরা কষ্ট করছি, ছোট-খাট কাজও করছি অনেকে, কিন্তু, আমাদের সন্তানরা খুব দ্রুত আমেরিকার উচ্চ শিক্ষায় সাফল্যজনক রেজাল্ট করছে। আর এটাই আমাদের গৌরব।

এবার আমেরিকান প্যাসেঞ্জারগনের চোঁখে সত্যিকারের বিস্ময়ে জাগ্রত হলো। তারা বাঙালী কমিউনিটির জীবনাচরণ, সংস্কৃতি ও অগ্রগতির বিষয়ে অনেক কিছু তার কাছ থেকে জানতে লাগলো। অনেক কিছুই তাদেরকে বিষ্ময়াভিভূত করলো। বিদায় বেলায় তারা তাকে ৫০ডলার বকশিস দিতে চাইলে তিনি সানন্দে তা গ্রহন করতে অপারগতা প্রকাশ করলেন এবং তারা পীড়াপীড়ি করে তার নির্ধারিত ভাড়া প্রদান করলো।

কিছুদিন পর ভাগ্যক্রমে ঐ তিন প্যাসেঞ্জারের একজন আবার ঐ ড্রাইভারের প্যাসেঞ্জার হলেন। প্যাসেঞ্জার কথা প্রসঙ্গে ড্রাইভারকে বললো, “সেদিন গাড়িতে তোমার ও বাঙালী কমিউনিটির নতুন প্রজন্মের উচ্চ শিক্ষায় অগ্রগতির গল্প শুনে আমরা অবাক হয়েছিলাম। আসলে বাঙালি কমিউনিটির সাফল্যের এ দিকটা আমাদের অজ্ঞাত ছিলো। বাসায় গিয়ে এ বিষয়ে ষ্টাডি করেছি। ফলে আরো অনেক কিছু জানতে পেরেছি। সত্যিই, অনেক ক্ষেত্রে বাঙালি কমিউনিটি খুবই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আমি বলতে চাই, বাঙালি প্যারেন্টস আর ব্লেসড ফর আমেরিকা।” এবার বাঙালি ড্রাইভার তৃপ্তির হাঁসি হাঁসলেন। এক অজানা গৌবর ও অহংকারে তার মাথাটা অনেক উচুতে অনুভব করলেন।

হ্যাঁ, প্রবাসের মাটিতে বাঙালি কমিউনিটির প্রত্যেক পিতামাতার উচ্চ শীর ও সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত হোক আমাদের পরম গৌরবের ক্ষেত্র।

লেখক- যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক প্রবাসী। সম্পাদক- ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশে ইতিহাস।