নিজের জীবন বাঁচাতে মাসে লাখ-লাখ টাকা আয় করা চিকিৎসকেরা করোনার ভয়ে বিয়ানীবাজারে চেম্বার না করে পালিয়ে গিয়েছিলেন এতদিন। যার কারণে করোনাকালে চিকিৎসক সংকটে মারাত্মক দুর্ভোগে দিন কাটিয়েছেন উপজেলার সববয়সী রোগীরা। ভুক্তভোগীরা অভিযোগের পাহাড় জমিয়ে রেখেছিলেন পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে চেম্বার করা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। অনেক চিকিৎসক ফোন বন্ধ করে রেখেছিলেন, অনেকে ভুক্তভোগীদের ফোনকল পেয়েও চেম্বারে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এর মধ্যে অনেক চিকিৎসক দুর্যোগকালীন সময় থেকেই বিয়ানীবাজারে চেম্বার করা বন্ধ করে দিয়েছেন।

এদিকে করোনার প্রকট কমে যাওয়ায় আবারও গত কয়েকদিন থেকে নিজ নিজ চেম্বারে ফিরে এসেছেন তারা। আগের মত প্রতিদিন হাজার-হাজার টাকা আয় করছেন। সেই সাথে উপজেলায় নতুন নতুন চিকিৎসকের আবির্ভাব হচ্ছে। সপ্তাহে দুই-তিন দিন শোনা যায় ‘ওমুক চেম্বারে এখন থেকে নিয়মিত রোগী দেখবেন ওমুক ডাক্তার’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাকালীন সময়ে বিয়ানীবাজারের কর্মস্থল কিংবা প্রাইভেট চেম্বার ছেড়ে যাওয়া চিকিৎসকদের তালিকায় রয়েছেন খোদ স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তাও। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবকালীন সময়ে কিছুটা অভ্যস্থ হয়ে যাওয়ায় তারা ফের নিজেদের কর্মস্থল ও চেম্বারে ফিরেছেন। ভুক্তভোগীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে- মেডিসিন ও সার্জারির ডা. এসএম শাহরিয়ার, মেডিসিনের ডা. আবুল বাশার রোমান, মহিলা, মেডিসিন ও চর্মরোগের ডা. ফারহানা হক, অর্থপেডিক্স কনসালটেন্ট ডা. বিজন সাহা, প্রসূতি ও স্ত্রী রোগের ডা. হাসিনা আক্তার চৌধুরী ও ডা. অসীম কুমার সাহা, থাইরয়েড ও হরমোনের ডা. হাবিবুর রহমান, মিডিসিনের ডা. আব্দুস সালামসহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসক করোনার প্রকট পরিস্থিতিতে প্রায় দুই থেকে পাঁচ মাস বিয়ানীবাজারে নিজেদের ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ রেখেছিলেন। তবে প্রসূতির ডা. হাবিবা আক্তার ও তার স্বামী অর্থপেডিক্স কনসালটেন্ট এবং ডা. এ মাহমুদ আলীসহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসক এখনও বিয়ানীবাজারে নিজেদের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ রেখেছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএইচও শিশু রোগের ডা. মোয়াজ্জেম আলী খান চৌধুরী করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে নিজের চেম্বার চালু রাখলেও নিজের অসুস্থতার কারণে সপ্তাহ তিনেক চেম্বার করা থেকে বিরত ছিলেন। তবে তিনি সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় নিজের কর্মস্থল ও প্রাইভেট চেম্বারে ফিরে আসেন। ডা.  রাবেয়া বেগম, রওশন আরা ও ফয়েজ আহমদ রুবেল অল্প কিছুদিন প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ রাখার পর ফের শুরু করেছেন। এসব চেম্বারে নিয়মিত রোগীও দেখেছেন তারা।

এছাড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিয়ানীবাজারে নিজেদের প্রাইভেট চেম্বার চালু রেখেছেন। তারা হচ্ছেন- ডা. আহমদ হোসেন, ডা. মাসুম আহমদ, ডা. আবু ইসহাক আজাদ, ডা. শিব্বির আহমদ সোহেল, ডা. আব্দুস সালাম মুক্তা, ডা. ইফাজ সামিহ ও তার স্ত্রী আফরা আনান, ডা. ফাইমা শিরিন ও ডা. সাইফুল ইসলাম ভূইয়াসহ আরও কয়েকজন চিকিৎসক। করোনাকালীন সময়ে চেম্বার চালু রাখা এই চিকিৎসকদের প্রায় সকলেই স্থানীয়। চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে তাদের এমন ভূমিকায় মুগ্ধ বিয়ানীবাজারবাসী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাদের নাম ম্যানশন করে প্রশংসা করেছেন সুশীল সমাজ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ।

সরেজমিন শুক্রবার বিকালে পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঠিক আগের মত শুরু হয়েছে চিকিৎসকদের প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা। প্রত্যেক চিকিৎসকের চেম্বারের বাইরে রোগীদের দাঁড়িয়ে-বসে অবস্থান করতে দেখা গেছে। প্রায় ২০-২৫ জন রোগীর স্বজনদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ‘আমরা বিপদে আছি। রোগ হলে ডাক্তাদের কাছে আসতে হয়। করোনাকালে আমাদের দুর্ভোগে ফেলে তারা চেম্বার ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আমরা চাই তারা যে কোন দুর্যোগে আমাদের পাশে থেকে সেবা প্রদান করে যান।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরশহরের একজন ব্যবসায়ী বলেন, তারা আমাদের বিয়ানীবাজার থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করেন৷ আর করোনার সময় তারা পালিয়ে গিয়ে রোগীদের দুর্ভোগে ফেলেছেন৷ পৌর এলাকার বাসিন্দা ক্রিকেটার আহমদ এহছানুল কাদির বলেন, করোনাকালে তাদের বিয়ানীবাজার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। তারা যেহেতু আবারও ফিরে এসেছেন, আমরা তাদেরকে অনুরোধ করব যাতে রোগীদেরকে ভাল সেবা দিয়ে যান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দু’জন চিকিৎসক বলেন, আসলে জীবনের নিরাপত্তা সবার আছে। আমরাও পরিবারের কথা চিন্তা করে চেম্বার বন্ধ রেখে চলে গেছিলাম। করোনার সময়ে তো রোগীদের চিকিৎসা দেয়া চিকিৎসক হিসেবে কর্তব্য ছিল কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, আসলে আমাদের চেম্বার এক স্থানে আর পরিবার অন্যস্থানে হওয়ায় আমরা করোনাকালীন সময়টাতে ঘরবন্দী ছিলাম। তাই চেম্বার করা হয়নি।

বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আবু ইসহাক আজাদ বলেন, চিকিৎসকদের পেশা হচ্ছে মহান। বিপদে যে সকল চিকিৎসক মানুষকে চিকিৎসা না দিয়ে পালিয়ে যান এটা ডাক্তার হয়ে করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের উচিত দুর্যোগকালীন সময়েও ভাল ট্রিটমেন্টের দ্বারা রোগীদের সেবা করে যাওয়া।