নভেল করোনাভাইরাস : প্রকৃতির ভয়াবহ প্রতিশোধ (১ম পর্ব) 

শেষ পর্ব-

মানুষ বড় অসহায়ঃ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজীউল হাসান খান ২১ মার্চ শনিবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেন, বর্তমান বিশ্ব দুটো বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে। দেখেছে বহু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্যোগ। মহামারী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মানুষ দেখেছে কলেরা, বসন্ত, টাইফয়েডসহ অনেক রোগের প্রকোপ। কিন্তু করোনাভাইরাসের মত একযোগে এতো সবগ্রাসী বিস্তার এর আগে তেমন ভাবে দেখা যায়নি। …….. একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস এর কাছে পারমাণবিক শক্তিও অচল ও অসহায়।

কোনো একজন ফেসবুকে চরম সত্য তুলে ধরে স্ট্যাটাস দিয়েছেন এভাবে— নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার শূন্য। লন্ডন ব্রীজে হাঁটছে না মানুষ। কাবার চারপাশে ঘুরছে না মুসলমান। ভ্যাটিকানে মানুষহীন কবুতর। ভেনিসের জলে ভাসছে না নবদম্পতি আর পর্যটক। সমগ্র পৃথিবী যুদ্ধ ছাড়াই অবরুদ্ধ। শূন্য গগনে উড়ছেনা প্লেন। সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকছেনা আন্তঃদেশীয় ট্রাক আর ট্রেন। দাপটটা দেখছেন তো! ওয়াট এ পাওয়ার অব আল্লাহ! কোন সার্কুলার নেই, নোটিশ নেই। সব কিছু স্থবির। আসলে মানুষের কোনো ক্ষমতাই নেই। ক্ষমতা তো একমাত্র মহান রাজাধিরাজের।

ব্রিটেন তাদের রাজপরিবারের সদস্যদের ঐতিহ্যবাহী বাকিংহাম প্যালেস থেকে সরিয়ে করোনা মোকাবেলায় বিশেষ ভাবে প্রস্তুত করা উইন্ডসোর প্রাসাদের কয়েকটি কক্ষে স্থানান্তর করেছে, যা গত ৭০০-৮০০ বছরের ইতিহাসে ব্রিটেনে ঘটেনি। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কোনো রাজা-রানী সপরিবারে বাকিংহাম প্রাসাদ ত্যাগ করেননি।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো তার দেশের করোনা পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে সমব্যথী হয়ে অস্রু বিসর্জন দিয়ে প্রকৃতির কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।

এছাড়াও, ইতালির রাজধানীর সবচেয়ে বড় হাসপাতালের পরিচালক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন, বাঁচব কিনা জানিনা তবে বেঁচে থাকলে এমন নির্মম অভিজ্ঞতা কোনদিন ভুলবো না। অধিকন্তু, এক ধরনের মানসিক বিকলাঙ্গতা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

গত ২৭ মার্চ শুক্রবার এটিএন নিউজ একটি সচিত্র প্রতিবেদনে মানুষের অসহায়ত্বকে তুলে ধরেছে নিপুণভাবে। ‘বিশ্বে মানুষের সম্পদ যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে বৈষম্য। তীব্র বৈষম্যের এই পৃথিবীকে হঠাৎ করে একই সমতলে নামিয়ে এনেছে ভয়ানক করোনাভাইরাস। প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে নিঃস্ব মানুষ সবাই অসহায় করোনার কাছে। রাষ্ট্রনায়ক থেকে ক্ষেতে কাজ করা কৃষক, শীর্ষ ধনী থেকে বস্তির ছিন্নমূল মানুষ কেউ বাদ যায়নি করোনার ছোবল থেকে। করোনা মানেনি কোন দেশের সীমা, গায়ের রং কিংবা নারী-পুরুষের ভেদাভেদ। পুরো বিশ্বকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একই সমতলে। যেখানে সবাই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে সমানভাবে। ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করেছে মানুষকে।‘

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেছে, ‘সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন প্রতিষেধক। আর সব দেশের চিকিৎসক-নার্সরা দিনরাত এক করে ফেলছেন অসুস্থ মানুষগুলোকে বাঁচানোর প্রাণান্তর চেষ্টায়।.

মানব সভ্যতাকে এক অসহায় মুহূর্তে একজোট করে করোনাভাইরাস দেখিয়েছে মানুষ না চাইলেও প্রকৃতি পারে মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসতে।

লকডাউনের কারণঃ মানুষকে ঘরে বন্দি করে কী লাভ? উত্তরটা দিচ্ছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস। তিনি বলেছেন, একটা মাসও যদি সংক্রমণ পিছিয়ে দেয়া যায়, তা আমাদের সুযোগ দেবে সক্ষমতা তৈরির। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত হবে। ভ্যাকসিন বাজারে আসার সময়টাও কাছে চলে আসবে। সংক্রমনের দাবানল একমাস পিছিয়ে দিতে পারলেও তা বহু জীবন বাঁচাবে।

অন্যরকম খবরঃ ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের দিকে দৌড়াতে গিয়ে কার্বন নিঃসরণ করে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়িয়ে পরিবেশকে করেছি আমরা উত্তপ্ত ও দূষিত। পৃথিবী লকডাউনে থাকায় বায়ুদূষণ কমছে। প্রাণ ফিরে পেয়েছে প্রকৃতি। প্রকৃতি নিজেকে সুযোগ পেয়ে গুছিয়ে নিয়েছে; কারো জন্য অপেক্ষা করেনি।

চ্যানেল ২৪ টিভি ২৭ মার্চ শুক্রবার জানিয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে ডলফিন বিচরণ করছে। যা এতদিন পর্যটকদের কারণে অসম্ভব ছিল। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডলফিনের বিচরণই বলে দিচ্ছে সমুদ্র তার আপন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

মৃত্যু ঝুঁকি কাদের বেশিঃ বিশেষত যারা বুকের কিংবা ফুসফুসের রোগে ভুগছেন, বয়স ৫৫ পেরিয়ে গিয়েছে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা কিংবা কোন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন, তাঁরা ঝুঁকিতে আছেন। চীন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৃদ্ধদের বিশেষ করে যারা দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এরইমধ্যে করোনাতে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন বয়স্করাই।

বর্তমান পরিসংখ্যানঃ যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির দেয়া তথ্য মতে,  নোবেল করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন বিশ্বের ৭ লাখ ৮৫ হাজারের উপরে মানুষ। এর মধ্যে মারা গেছেন ৩৭ হাজার ৮২০ জন। আর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৯৯টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়েছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তবে মৃতের হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ইতালি। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা সাড়ে ১১ হাজারের অধিক। আইইডিসিআর এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ৪৯ জন। মৃত্যুবরণ করেছেন পাঁচজন।

আশার দিকঃ করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীন পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ৯০ ভাগ শুরু হয়ে গেছে চীনে।

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, সকলের অগোচরে অন্য একটা যুদ্ধ চলছে। যেদিন থেকে ভাইরাসটি তার জাল ছড়াতে শুরু করেছে, চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র নেমে পড়েছে অন্য এক লড়াইয়ে— ‘কে আগে প্রতিষেধক আনবে বাজারে’। ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা গুলোর মধ্যে অন্য সময়ে তীব্র রেষারেষি লেগে থাকে। কিন্তু এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তারাও পরস্পরকে সবরকম সহযোগিতায় রাজি।

মানবিক দিকঃ পুরোপুরি কিংবা সীমিত লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন দরিদ্র দুস্থ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এই মানুষ গুলোর শোচনীয় অবস্থা লাগবে সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এটিকে করোনা প্রতিরোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি যেকোনো নির্বাচনে যারা জনদরদি হিসেবে আবির্ভূত হন ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।
যেহেতু বৃদ্ধদের আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি তাই প্রবীনদের প্রতি আরো যত্নশীল হতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ঘরে মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)।

করণীয়ঃ দুই উপায়ে কোভিড-১৯ এর প্রকোপ থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি।

একটি হলোঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। যেমন—

ক) কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে ঘন ঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া।

খ) নাক, চোখ ও মুখে হাত না দেয়া।

গ) প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে না যাওয়া। ভীড় এড়িয়ে চলা। অন্য মানুষের থেকে কমপক্ষে ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা।

ঘ) হাঁচি-কাশির সময় নিজের কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে নাক মুখ ঢেকে ফেলা।

ঙ) যেখানে সেখানে থুথু না ফেলা।

চ) মাছ মাংস দুধ ডিম কাঁচা না খাওয়া, যথেষ্ট সিদ্ধ করে খাওয়া।

ছ) কাঁচা ফল সবজি খুব ভালো করে ধুয়ে নেয়া।

অন্যটি হলোঃ সৃষ্টিকর্তার নিকট নিজেকে সমর্পণ করা। জর্ডানের রয়্যাল আল বাইত ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে করা ইসলামিক চিন্তার জন্য ৫০০ জন প্রভাবশালী মুসলিম স্কলারের একজন, জিম্বাবুয়ের নাগরিক মুফতি ইসমাইল মেনক বলেছেন, বর্তমান অবস্থায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের মহানবী (সাঃ) প্রায় চৌদ্দ শ বছর আগে এ ব্যাপারে বলে গেছেন, মহামারীর সময় গুলিতে নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে।

তিনি আরও বলেন, হযরত আয়েশা (রঃ) সূত্রে বুখারী শরীফের একটি হাদিস রয়েছে। সেখানে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘যদি তুমি সতর্কতার জন্য বাড়িতে অবস্থান করো এবং ধৈর্য ধরো, তবে আল্লাহ পাক অবশ্যই তার জন্য পুরস্কৃত করবেন’।

মহানবী (সাঃ) বলেছেন, অসুস্থ অবস্থায় কেউ কর্মক্ষেত্রে যাবে না। আল্লাহ পাকের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আক্রান্ত জায়গায় গেলে সেখানে অবস্থান করতে হবে। কেউ আক্রান্ত এলাকার বাইরে আসবে না অথবা বাইরে থেকে কেউ আক্রান্ত জায়গায় যাবে না।

মুফতি মেনক বলেন, একজন মহানবীকে (সাঃ) জিজ্ঞাস করলেন, রোগ-শোক, দুর্যোগ থেকে আমরা কিভাবে রক্ষা পাবো? তিনি হাদীসে তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। প্রথমতঃ ‘মুখের কথাকে সংযত করা’। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন তথ্য বা বার্তা শেয়ারের ক্ষেত্রে সচেতন থাকুন। ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন। দ্বিতীয়তঃ ‘বাড়িতে থাকা’। তৃতীয়তঃ ‘আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখা’।

তিনি আরো বলেন, নিজের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিজেকে রক্ষা করাও ইবাদতের সমান। ঘরে বসে থাকার সময়গুলিতে জ্ঞান চর্চা করুন। ভেঙে পড়বেন না। আতঙ্কিত হবেন না। স্বাস্থ্য নির্দেশনা গুলো মেনে চলুন। আল্লাহপাক এই ভাইরাস থেকে পৃথিবীবাসীকে রক্ষা করুন।

লেখক- প্রভাষক, আছিরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।