মাঠে গিয়ে ধুলো-কাদা মাখা হয় না আর এখন। ঘেমে-নেয়ে বিকেলে খেলা শেষে বাড়ি ফেরার চিরারিত দৃশ্যটা আজকাল যেন হারিয়ে যাচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় খেলার জায়গার অভাব, পড়ার চাপ, যেমন তেমন বাইরে গেলে খারাপ হবার ভয় – কতই না অভিযোগ অভিভাবকদের! তার বদলে অভিভাবকরা বিনোদনের নামে যা তুলে দিচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের হাতে, তার ক্ষতির পরিমাণটা তাদের ধারণারও বাইরে। বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চিত্র ক্রমেই মারাত্মক হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তাই নেই কোন পড়াশোনার চাপ। অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে সময় পার করছে ঘরে বসে। সময় পার করতে অধিকাংশ শিশু-কিশোর বেঁচে নিয়েছে অনলাইন গেম। অনলাইন গেমের মধ্যে অন্যতম পাবজি এবং ফ্রী ফায়ার । এই অনলাইন ব্যবহার দিন দিন কেবল বেড়েই চলছে। শিশু থেকে কিশোর দিন থেকে রাত সারাক্ষণই এই গেমে মগ্ন। দিন দিন এই গেম নেশার চেয়ে ভয়ংকর হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘরের চার দেয়ালের ভেতরেই আটকা পড়ছে শিশুদের বর্ণিল শৈশব। এতে করেই খেলাধুলার আনন্দ খুঁজে ফিরছে মাউসের বাটন টিপে, কম্পিউটারের পর্দায় গেমস খেলে, কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। অনেক সময় তাদের এ আকর্ষণটা চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে। ধীরে ধীরে তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কম্পিউটার-মোবাইল-ট্যাব গেমসের ওপর। এসব ভিডিও গেমস শিশু-কিশোরদের প্রকৃত শৈশব-কৈশোর কেড়ে নিচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্বের মতো আমাদের অনেক পরিবারে বাবা-মা দুজনই কর্মব্যস্ত। উভয়েই ছুটছেন ‘ক্যারিয়ার ও সফলতা’ নামক সোনার হরিণের পিছনে। আবার গ্রামীণ এলাকায় বাবা-মায়ের কর্ম ও পারিবারিক ব্যস্ততায় একাকীত্বে থাকতে হচ্ছে সন্তানদের।  এতে সন্তান বড় হচ্ছে প্রায় একা একা। অনেক অপরিণামদর্শী মায়েরাই শিশুকে খাবার খাওয়াতে, তার কান্না থামাতে- টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও ভিডিও গেমসের অভ্যাস করাচ্ছেন।

সরেজমিনে পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সকাল-সন্ধ্যা নিজের বাড়ি, খেলার মাঠ এমনকি রাস্তার পাশে মোবাইল হাতে নিয়ে হিন্দি ও বাংলা ভাষায় কথা বলায় ব্যস্ত শিশু-কিশোররা। এর মধ্যে ‘মার মার’ এই কথাগুলো তাদের মুখে সবচেয়ে বেশি শুনা যাচ্ছে। অনেককে আবার অবলীলায় হিন্দি ভাষায় কথা বলতেও দেখা গেছে। উপজেলার তিলপাড়ায় ইউনিয়নের একটি গ্রামে গিয়ে পাবজি খেলেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানায়, এ গেম একা ও গ্রুপে খেলা যায়। মাঠে অনেকগুলো টিম ছাড়া হয়। সবাইকে মেরে যে বেঁচে থাকবে সেই জয়ী হয়। বেশিরভাগই গ্রুপে খেলতে পছন্দ করে। গ্রুপ করে খেলতে গেলে ওভার ফোনে ইনস্ট্রাকশন দিতে হয়। মানে একা বসে বসে কথা বলার মতো। আবার খেলার সময় যেন কেউ বিরক্ত না করে সেজন্য একা থাকতে হয়। মানে অন্য কোথাও মনোযোগ দেওয়া যাবে না।

মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা এবং হাতের নাগালের মধ্যে থাকা ইন্টারনেটের কারণেই এসব গেমের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। বর্তমানে এসব গেমে অত্যধিক আসক্ত হয়ে পড়ছে শিশু থেকে শুরু করে কিশোর এবং তরুণরাও। এসব গেম খেলে এমন কিছু শিশু-কিশোরের অভিভাবকদের জিজ্ঞাসায় জানা যায়, তারা এখন তাদের বাচ্চাদের নিয়ে প্রায় হতাশ । ঘুম, খাবার এবং গোসল কোন কাজেই তাদের ধ্যান পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় অভিভাবকদের সরকারের নিকট আবেদন করেন যাতে এই গেইমগুলো বাংলাদেশ থেকে তাদের আইপি ব্লক করে দেয়া হয়। তা না হলে বর্তমান প্রজন্ম ধ্বংসের পথে চলে যাবে।

আবুল কালাম নামে এক অভিভাবক জানান, এখন স্কুল বন্ধ থাকায় অনলাইনে ক্লাস চলছে। বাড়িতে বসে সেই ক্লাসে অংশ নেয়ার জন্যই বাচ্চাদের হাতে মোবাইল তুলে দিয়েছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। আমার সন্তানরা মোবাইলে কি একটা গেমস আছে ওইটা নিয়েই সারাদিন মগ্ন থাকে। পড়াশুনার কথা আর কি বলবো-এই গেমস না খেললে তারা নাকি ভাত খেতে পারে না, ঘুমাতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। এসব গেমস আমাদের দেশে বন্ধ করে দেয়ার জন্য আমি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

সচেতন মহল বলছে, এসব গেমসে আসক্তির কারণে শিশু-কিশোররা পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। খেলার এক পর্যায়ে এসে তারা ভায়োলেন্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি এটি আলোচিত আরেক ‘ব্লু হোয়েল’ গেমসের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। লেখাপড়ায় ফাঁকি দিয়ে সারা রাত এই গেম খেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়েছে। পড়ালেখায় অনেকের মনোযোগ কমে গেছে। গেমটি খেলতে না পারলেই মানসিক যাতনা তৈরি হয়। এ কারণে এসব পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো খেলাগুলো নিয়ন্ত্রণে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত।