সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীদের প্রাত্যহিক জীবন ও পূজা-অর্চনায় ধূপের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ধূপবিহীন হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবনাচরণ এককথায় অসম্পূর্ণ। প্রতিদিন সন্ধ্যাবাতির সময় ধূপ-ধোনা না হলে পবিত্রতাই যেনো বিনষ্ট হয়। এছাড়া ধূপ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী একটি বস্তুও বটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূপ মনকে প্রফুল্ল রেখে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ধূপের ধোঁয়া ফুসফুস পরিস্কার করে কফ-কাশি দূরে রাখে। বর্তমান সময়ের ধূপ গাছের অপ্রাপ্যতা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধূপ সংগ্রহে অজ্ঞতার কারণে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ধূপ গাছগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলে ধূপশিল্প ক্রমশ অলাভজনক শিল্পে পরিণত হতে চলেছে।

বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পিত উপায়ে ধূপ সংগ্রহের অভাবে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার সংরক্ষিত বনের ধূপগাছগুলো অবহেলায় বিনষ্ট হচ্ছে। ধূপ কষ সংগ্রহের জন্য একপ্রকার ধূপ জাতীয় গাছ ছাড়াও শাল ও গজারি গাছের কষ থেকেও ধূপ উৎপন্ন হয়ে থাকে। এসব গাছের স্বাস্থ্যরক্ষা ও রোগ-বালাই হতে রক্ষা পেতে প্রতি মৌসুমের মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গাছগুলো ধূপ-কষ নির্গমণ করে থাকে। প্রাকৃতিক নিয়মে এ কাজগুলো সম্পন্ন হলেও মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে শুধু নয়, বনে বসবাস করা লোকজন ও আদিবাসীরা বছরের সব সময়ই বনের কিছু গাছ অপরিকল্পিতভাবে কেটে কষ সংগ্রহ করে থাকে।

ধূপ সংগ্রহে পরিকল্পনা, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা না থাকায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ধূপ গাছগুলো বিনষ্ট ও লুপ্তপ্রায়। ধূপ সংগ্রহকারীরা গাছগুলোকে দা দিয়ে কুপিয়ে অপরিকল্পিত উপায়ে ধূপ-কষ সংগ্রহ করার ফলে গাছগুলো অকালেই বিনষ্ট হচ্ছে। অনেক গাছ ইতোমধ্যে মরেও গেছে। তবে অপরিকল্পিতভাবে এবং অবৈজ্ঞানিকভাবে ধূপ-কষ সংগ্রহকারীরা মনে করেন, এতে করে ধূপ গাছের কোনো ক্ষতি সাধিত হয় না। বয়স্ক গাছ স্বাভাবিকভাবেই মরে যায়। দা দিয়ে কুপিয়ে ধূপ-কষ সংগ্রহ করায় কোনো গাছ মরে না। কারণ প্রতিটি গাছেই হালকাভাবে দায়ের কোপ দিয়ে কষ সংগ্রহ করা হয়।

ধূপগাছের কষ সংগ্রহকারী মাথিউরা চা বাগানের চা শ্রমিক সুজিত জানান, পরিকল্পিতভাবে ধূপ সংগ্রহ করলে এর গুনাগুণ ঠিক থাকে। তিনি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বনবিভাগ সূত্র আরও জানায়, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, রাজকান্দি রেঞ্জ, আদমপুর বনাঞ্চল, আটকান্দি বিট, কুরমা বনাঞ্চল, কালাছড়া বনাঞ্চল, চাউতলী বিট, কুলাউড়া উপজেলার গাজীপুর বনবিট, ইছলাছড়া বনবিট, বড়লেখা উপজেলার মাধবকু- বনাঞ্চল, জুড়ী উপজেলার সাগরনাল বনবিট, লাঠিটিলা বিট, জুড়ী রেঞ্জ-১, জুড়ী রেঞ্জ-২, হারাগাছা পাহাড়, শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও বনাঞ্চল, জাম্বুরছড়া, হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল, ছনাবাড়ি বিট, হরিণমারা বিট, গরমছড়ি বনবিট, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রঘুনন্দনপুর বিট, তেলমা বিট প্রভৃতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ব্যাপকসংখ্যক ধূপ জাতীয় গাছ থাকলেও ধূপ সংগ্রহের অভাবে এগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ধূপ সংগ্রহের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও পরিকল্পিত উপায়ে ধূপ সংগ্রহের ব্যবস্থা না থাকায় এ দুই জেলায় ধূপশিল্প ও ধূপ জাতীয় কুটির শিল্প গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডি.এফ.ও) মনির রহমান জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে পরিকল্পিত উপায়ে ধূপ সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে।