গ্রামীণ কুসংস্কার আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিয়ানীবাজার পৌরসভার নয়াগ্রাম এলাকার বাসিন্দা চার সন্তানের জননী হেনা জাহান কলি। কেবল সফল মা হিসেবেই নয়- তীব্র ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্র নিষ্ঠায় নিজ পরিচয়ে হেনা এখন উদোক্তা হিসেবে অন্য নারীদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন।

পৌরসভা খাসার দিঘীরপার এলাকায় ‘মডার্ন বেকারি’ নামে একটা প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়েই পরিবার চালাতেন হেনার স্বামী আনোয়ার হোসেন। স্ত্রী-সন্তানাদি নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু বছর পাচেক আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর সন্তানাদি নিয়ে বিপদে পড়ে যান তার স্ত্রী হেনা জাহান কলি। স্বামী হারানোর বেদনা, ঋণের বোঝা আর সন্তানদের ভরণপোষণ ও পড়ালেখার ব্যয় নিয়ে দু’চোখে যেন অন্ধকার দেখতে পান তিনি। কিন্তু একজন দৃঢ় প্রত্যয়ী মা হিসেবে থেমে থাকেননি হেনা। হাল ধরেন স্বামীর সেই বেকারির। নিজেই বেকারির উৎপাদিত পন্য পায়ে হেঁটে দোকানে দোকানে বাজারজাত করতে শুরু করেন।

হেনা জাহান কলি জানান, স্বামীর ঋণ আর সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে কিছুটা স্বচ্ছল হলেও আয়ের অন্য কোন খাত না থাকায় নিজের প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রসারিত করতে পারছেন না তিনি। বর্তমানে তার বেকারিতে ৫জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হলেও আনুসাঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় বহন করতে কষ্ট হচ্ছে তার। তবে হেনা জানান, তার বেকারির জন্য একটি মিক্সার মেশিন ও একটি ভ্যানগাড়ি কিনতে পারলে তার আয়ের পথ কিছুটা সুগম হবে। আর তাই নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়ে সহযোগিতা চেয়েছেন প্রবাসী ও বিত্তবানদের। তিনি বলেন, উৎপাদিত পণ্য নিজেই দোকানে পৌঁছে দেন। এ কাজের জন্য একজন লোক রাখলে তাকে যে বেতন দিতে হবে। কিন্তু পণ্য বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে একজন লোক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

হেনা জাহান কলির বলেন, স্বামী আনোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর তার অনেক টাকা ঋণ ছিল তিনি এ বেকারির আয় থেকে এসব ঋণ তিনি পরিশোধ করেছেন। একই সাথে সন্তানদের লেখাপড়াও করাচ্ছেন এর আয় থেকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ব্যবসা আগের মতো নেই। সংসারের ব্যয়, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ আর বেকারির শ্রমিকদের বেতন ভাতা সংকুলান করতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে।

হেনা জানান, কোন উপায়ান্তর না দেখে সন্তানদের ভরণপোষণ করতে স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বেকারির পণ্য উৎপাদন ও বিপননে তিনি নিজেই নেমে পড়েন। মহিলা হিসাবে বিষয়টি প্রথম দিকে লজ্জা পেতেন। তবে ব্যবসায়ী ও নিকট আত্মীয়দের সমর্থন পেয়ে তিনি এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। হেরা মনে করেন মহিলারা পুরুষদের মতো উৎপাদনশীল কাজে এগিয়ে আসলে। নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে পণ্য উৎপাদন ও বিপনন শুরু করলে আয়ের পাশাপাশি অনেকের কর্মস্থান হবে। তিনি এক্ষেত্রে প্রশাসনসহ সব মহলের সহযোগিতা চান।

সামাজিক ব্যবস্থায় নারীরা এখনো পিছিয়ে রয়েছে। নিজ প্রচেষ্টায় সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে নারীদের পোহাতে হচ্ছে নানা প্রতিকূলতা। তবে সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে সমাজের পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত, নির্যাতিত নারীরাই বিনির্মাণ করবে নতুন একটি সমাজ- এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

এবিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন-

কুসংস্কার ও প্রতিবন্ধকতা জয় করে সফল নারী উদ্যোক্তা বিয়ানীবাজারের হেনা