অনলাইন সংবাদপত্র হলো একটি সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ যা একক ভাবে শুধুমাত্র অনলাইনে প্রকাশিত অথবা কোন মুদ্রিত সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ হিসেবেও প্রকাশিত হতে পারে। সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণে ব্রেকিং নিউজ প্রচারের সুবিধা সম্প্রচার সাংবাদিকতার সাথে সংবাদপত্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করে। সংবাদপত্র শিল্পে একটি সংবাদপত্র টিকে থাকার শর্ত হিসেবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা, শক্তিশালী ব্র্যান্ড স্বীকৃতি এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের সাথে প্রতিষ্ঠিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নির্দেশ করা হয়। এছাড়াও মুদ্রণ প্রক্রিয়ার তুলনায় অনলাইন প্রকাশনা সাশ্রয়ী বলে এই আন্দোলন আরো বেগবান হয়েছে। হালে তরতাজা খবর মানেই যেন সহজলভ্য অনলাইন সংবাদপত্র।

ডিজিটাল বাংলাদেশে ছেলে, জোয়ান, বৃদ্ধ, নারী, কিশোরী থেকে গৃহবধূ- সবার হাতে হাতে ইন্টারনেট সম্বলিত ফোন। মানুষ সামাজিক নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে খবরের পোর্টাল- সবখানেই বিচরণ করছে দিনরাত। এখন সত্যি সত্যিই আর মানুষকে সবার আগে সবশেষ বিস্তারিত খবর জানতে পরদিন সকালের ছাপা সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়না। এক ক্লিকেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবকিছু। তাই বলে যে মুদ্রিত সংবাদপত্রের গুরুত্ব বা ভূমিকা কমে গেছে তাও বলা যাবেনা- সেটি নিয়ে আরেকটি নিবন্ধ লেখা যেতে পারে।

আমাদের অনলাইন সংবাদপত্রের এই বিস্ফোরণ বা বুমটা খুব বেশি দিনের নয়। বিশ্বের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে আর আমাদের বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে। সময়ের ফারাকের দিকে তাকালেই বোঝা যায় নতুন কিছু গ্রহণে আমাদের দ্বিধা ও জড়তার কথা। দেরিতে হলেও তবু বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদপত্রের এক বিশাল বিস্ফোরক যাত্রা শুরু হয়েছে এবং সত্যিকার অর্থে এখন টেলিভিশনগুলো থেকে শুরু করে জাতীয় দৈনিক- যারা ছাপার বাইরে যেতে নাক সিটকাতো; তারাও এখন প্রত্যেকে অনলাইন ভার্সনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক।

বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর অষ্টম বর্ষে পদার্পন করছে এটি খুবই আনন্দের এবং একই সঙ্গে গৌরবের। এই পোর্টালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দু’কথা বলার আগে সামগ্রিক চিত্রটি একনজরে দেখে না নিলেই নয়। আগেই বলেছি- সংবাদপত্রের এই ডিজিটাল ধরণের ধারণাটি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়েস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৪ সালে ‘নিউজ রিপোর্ট’ নামে প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রকাশিত হয়। এরপর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র তাদের অনলাইন সংস্করণ চালু করে। তবে ২০০০ সালে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত ‘সাউথপোর্ট রিপোর্টার’ আধুনিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে পরিচিতি পায়।

যদিও বিশ্বজোড়া অনলাইন সংবাদপত্রেও মুদ্রিত সংবাদপত্রের মতোই আইনি সীমা নির্ধারিত রয়েছে; যুক্তরাজ্যর ধারায় অন্যান্য দেশেও আইন অনুযায়ী অপলেখ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং কপিরাইটের মতো বিষয়গুলো অনলাইন সংবাদপত্রের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। দেশ ভেদে এই কড়াকড়িটা আরও বেশি হয়ে থাকে। সাংবাদিকরাও সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করেন কোথাও কোথাও। তবে বাংলাদেশে লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে অনলাইন পোর্টালগুলোর সবাই যে সুস্থ সাংবাদিকতা করছে তাও নয়। পূর্ব সিলেটের একেবারে সীমান্তঘেষা প্রবাসী অধ্যূষিত বিয়ানীবাজার উপজেলা থেকে পরিচালিত বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর এক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস, সে বিষয়টি নিয়ে পরে আসছি।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। দেশজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট। আজকের সংবাদ জানতে আগামীকালের সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই মানুষের হাতে। যখনই ঘটনা তখনই সংবাদ। দ্রুত অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল। কম খরচে এবং সহজলভ্য দ্রুতগতির ইন্টারনেটের কারণে এই মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আগ্রহও ক্রমশ বাড়ছে। পাঠকরাও নির্ভর করছেন- আস্থা রাখছেন বিশ্বাসযোগ্য, নিরপেক্ষ এবং পেশাদার অনলাইন সংবাদপত্রগুলোর ওপর।

বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ২৪.কম। বিশিষ্ট সাংবাদিক আলমগীর হোসেন ছিলেন এর প্রধান সম্পাদক ও অন্যতম উদ্যোক্তা। তবে আর্থিক সংকটের কারণে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিডিনিউজের মালিকানা কিনে নেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালেদী। এর কিছু সময় পরেই যাত্রা শুরু করে আরেক অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য এডিটর ডট নেট। ২০০৭ সালে আলমগীর হোসেন আবারও শুরু করেন নতুন একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও বার্তা সংস্থা একাত্তর নিউজ সার্ভিস তবে বিডিনিউজের পরে অনলাইন সাংবাদিকতায় জনপ্রিয় হয়ে উঠে অনলাইন নিউজ পোর্টাল শীর্ষ নিউজ ডটকম।

২০০৯ সালের ১৯ আগস্ট যাত্রা শুরু করা শীর্ষ নিউজের সম্পাদক একরামুল হক ২০১১ সালের শেষ দিকে গ্রেফতার হওয়ার পর পোর্টালটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ১ জুন নতুনভাবে আপডেট শুরু করে শীর্ষ নিউজ। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলমগীর হোসেন আবারও শুরু করেন নতুন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর.কম। এর কয়েক মাস পরেই সাংবাদিক সরদার ফরিদ আহমেদের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে বার্তা টুয়েন্টি ফোর ডট নেট। গণমাধ্যম বিষয়ক সংবাদ প্রকাশের জন্য এই পোর্টাল বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। আর্থিক সংকটের কারণে ২০১২ সালের শেষ দিকে বন্ধ হয়ে যায় বার্তা টুয়েন্টি ফোর ডট নেট। এরপর তারই নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে নতুন বার্তা ডট কম। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু পেশাদার অনলাইন সংবাদপত্র। রাজধানী ঢাকার গন্ডি পেরিয়ে অনলাইন সাংবাদিকতা এখন বিভাগ, জেলা এমনকি উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে গেছে। তবে শত শত পোর্টালের মধ্যে মানুষ কিন্তু ঠিকই বেছে নিচ্ছে পেশাদার, আস্থা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। জেলা এবং উপজেলা থেকে পরিচালিত বেশ কিছু পোর্টালও সেই তালিকায় অগ্রগামী হয়েছে- যার মধ্যে বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর অন্যতম।

অনলাইন সংবাদপত্রগুলো এখন তাৎক্ষণিক ঘটনার সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি জাতীয়, রাজনীতি, অর্থনীতি-ব্যবসা, খেলাধুলা, মুক্তমত, শেয়ারবাজার, বিনোদন, লাইফস্টাইল, আইন, ধর্ম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সাহিত্য, শিশুসাহিত্য, ফিচার, ধর্ম-দর্শন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, মতামতসহ বিশেষ প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকেও বিভিন্ন খবর নিউজ পোর্টালে ঠাঁই পাচ্ছে আজকাল। চলছে সুস্থ্য ও অসুস্থ্য দুই ধারারই প্রতিযোগিতা। অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর মধ্যে বেশিরভাগের মাঝে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে রয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত আর অশুভ প্রতিযোগিতা।
অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যটা যাচাই ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ করে শীর্ষস্থানীয় অনেক নিউজ পোর্টাল। যেহেতু পরবর্তীতে সংবাদ পরিবর্তন বা সম্পাদনার সুযোগ রয়েছে সেহেতু সবার আগে সংবাদ প্রকাশ করে পরে আবার তা পরিবর্তনও করছে অনেকে। এতে একদিকে পোর্টালের সৃজনশীলতা যেমন প্রকাশ পায় তেমনি অনেক ক্ষেত্রেই ফুটে ওঠে অনৈতিক সাংবাদিকতার চর্চাও। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের ইঁদুর দৌড়ে জড়িয়ে প্রতিনিয়ত নিউজ পোর্টালগুলোতে ভুল উদ্ধৃতি বা তথ্য বিকৃতিও ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজবকে ভিত্তি করে অনেক নিউজ পোর্টাল নানা রকম সংবাদ প্রকাশ করছে। যা সাংবাদিকতার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, নিউজ পোর্টালের পাঠক বৃদ্ধির জন্য অনেক পোর্টাল অশ্লীল ছবি ও ভিডিও যুক্ত করে নানা রকম বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করছে। তবে এই ধরনের পোর্টালের প্রতি পাঠকের তাৎক্ষণিক আকর্ষণ থাকলেও স্থায়ী গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে।

সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ অনলাইন নিউজ পোর্টালে দেখা যাচ্ছে ‘কপি-পেস্ট-এর নগ্ন প্রতিযোগিতা। এবিষয়ে অবশ্য এখনও কোনো নীতিমালা তৈরি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো এবিষয়ে অভিযোগ তুলতে পারে। কপিরাইট আইনে মামলারও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সবার আগে প্রশ্ন ওঠে নৈতিকতার। সেই মাপকাঠিতে বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর উত্তীর্ণ বলেই আমার মনে হয়। কারন পোর্টালটির সাংবাদিকরা মাঠে-ঘাটে খেটেখুটে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন এবং তা আপলোড করেন।

ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শোনা গেলেও উপরের তথ্যগুলোকে এ কারনেই সামনে আনতে চেয়েছি যে- পূর্ব সিলেটের প্রত্যন্ত একটি জনপদ বিয়ানীবাজারের মাটি থেকেও যে জাতীয় পর্যায়ের একটি অনলাইন সংবাদপত্র পরিচালনা করা যায় তা ভাবতে অবাক লাগে এবং এ কারণে শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসাও জন্মায় সাংবাদিক এবং উদ্যোক্তাদের প্রতি। জহুরি হিসেবে নয়, পোর্টালটির একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবে বলতে পারি শত প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, সাংবাদিকদের উন্নত প্রশিক্ষণের অভাবসহ নানান পিছুটান থাকলেও তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঢাকার অনেক বড় বড় শিল্পগ্রুপও যেখানে যাত্রা শুরু করলেও খুব বেশিদিন পরিচালনার আগে তাদের ওয়েব পোর্টাল থমকে যায়- সেখানে শুধু আঞ্চলিক খবরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি অনলাইন পোর্টাল কিভাবে দেশ ও প্রবাসে লাখো মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিতে পারে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর। সাংবাদিকতায় একাডেমিক একটি টার্ম আছে- প্রক্সিমিটি বা নৈকট্য, অন্যদিকে গণমানুষকে সম্মৃক্ত করে বলেই এর নাম গণমাধ্যম। বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর এবং এর সহ প্রতিষ্ঠান এবিটিভিতে এর দুটোই বিদ্যমান। কারণ পোর্টালটি পূর্ব সিলেটের মানুষকে একাত্ম করে এক সুতোয় বেঁধে দেশ ও প্রবাসের মধ্যে এমন সেতুবন্ধন রচনা করেছে যা এর প্রতি আস্থা, ভালবাসা ও জনপ্রিয়তার অন্যতম চাবিকাঠি। কারণ মানুষ নাড়ির খবর আর হাড়ির খবর জানতে চায়। জানতে চায় তার নিজের, প্রতিবেশির, পরিচিতের, এলাকার খুঁটিনাটি সব সংবাদ। বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর সেই কাজটি খুব দক্ষতার সঙ্গে করছে।

অষ্টম বর্ষে পদার্পনের এই শুভ লগ্নে বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর এর প্রতিষ্ঠাতা ও স্বপ্নদ্রষ্টা রিজু মোহাম্মদকেও বিশেষ ধন্যবাদ জানাতে চাই। কারণ ব্যক্তিগত পরিচয় ও সুসম্পর্কের স্থান থেকে নয়, আমার বিবেচনায় পেশাদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে। সেই দৃষ্টিকোণে তার দূরদৃষ্টি আকাশ সমান। বিয়ানীবাজার নিউজ টোয়েন্টিফোর তার স্বপ্নের আকাশ স্পর্শ করুক, সাফল্যের সকল পালক যুক্ত হোক। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক, ঢাকা।

এবিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন-

বিয়ানীবাজারে দিনব্যাপী প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত