মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুস সাত্তার ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের সময় ২নং সেক্টরের চট্টগ্রাম এলাকায় শহীদ হয়েছিলেন। স্বামীহারা হয়ে স্ত্রী মেহেরজান বেগম (৬৫) কিছুটা মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী এখন পাগল অবস্থায় দ্বিতীয় মেয়ের বাড়িতে বসবাস করলেও তার নিরাপত্তার কথা ভেবে মেয়ে তাকে লাইলনের দড়ি (রশি) দিয়ে ঘরে বেঁধে রাখছেন। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা উত্তোলন করে নিচ্ছেন তারই শ্যালক জমশেদ হোসেন।

সরেজমিন রঘুনাথপুর গ্রামে গেলে এলাকাবাসী জানান, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুস সাত্তার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। এ সময় স্ত্রী মেহেরজান বেগম ও তাদের গর্ভজাত ২ বছরের সন্তান মেয়ে লাকি বেগমকে বাড়িতে রেখে যান। স্বামী মারা যাবার খবরটি শোনার পর থেকে স্ত্রী মেহেরজান কিছুটা মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন। স্বামীহারা হয়ে পড়ায় মেহেরজানকে দেশ স্বাধীনের পর এ গ্রামের তাহির আলীর সাথে দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। দ্বিতীয় দফায় মেহেরজানের আরও একটি মেয়ে সাফিয়া বেগমের জন্ম হয়। বড় মেয়ে লাকি দুই বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে মা মেহেরজান পুরোপুরি পাগল হয়ে যান। এরপর তার ছোটভাই অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য জমসেদ হোসেন ও অপর ভাই জসিম হোসেন মেহেরজানকে নিজ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে ছোটমেয়ে সাফিয়া বেগম মায়ের দেখাশুনা করছেন। তবে মা মেহেরজান বেগম পুরোপুরি পাগল হয়ে যাওয়ায় কোথাও কোনো দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন ভেবে তার নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে হাতে লাইলনের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখছেন মেয়ে। মাঝে মাঝে দড়ির বাঁধন খুলে দেওয়া হয়।

মেহেরজান বেগমের মেয়ে সাফিয়া বেগম জানান, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মা তার বাড়িতে আছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাদের মামা (শহীদ মুক্তিযোদ্ধার শ্যালক) অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য জমসেদ হোসেন ভগ্নিপতির ভাতার টাকা উত্তোলন করে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। তিনি ইচ্ছে হলে বোন মেহেরজানকে কিছু টাকা দেন আর বাকি টাকা নিজে নিয়ে যান। এ অবস্থায় মা মেহেরজান বেগম পুরো পাগল হয়ে এখন গুরুতর রোগে ভোগছেন। ঠিকমতো চলাফেরাও করতে পারছেন না। তার সার্বিক নিরাপত্তার কথা ভেবে মাঝে মাঝে বাড়িতে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছে।

অন্যদিকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা জালিয়াতি বন্ধ করে নাতি হিসেবে সে দাবিদার বলে ভাতা গ্রহণের অনুমতি দিতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে লাকি বেগমের ছেলে আসাদুল হক একরাম (১২) উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে চলতি বছরের ০৪ এপ্রিল আবেদন করে। এ আবেদনের তদন্ত চলছে বর্তমানে। মেহেরজান বেগমের সাথে কথা বললে তিনি জানান, তাকে কেনো বেঁধে রাখা হয় তা তিনি জানেন না। স্বামীর ভাতার কথা জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। জানালেন, তার স্বামীর ভাতার টাকাটা তার ভাই জমসেদ মিয়া তুলে খাচ্ছেন। লাকি ও সাফিয়া নামে তার দু’টি মেয়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অভিযোগ সম্পর্কে মেহেরজান বেগমের অভিযুক্ত ভাই জমসেদ হোসেন জানান, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য। ভাতা মেহেরজান বেগম নিজে উত্তোলন করে এ টাকা দিয়ে নিজের চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন। ভাই হিসেবে তিনি সাথে ছিলেন। বোন মেহেরজানের জরায়ূ ক্যান্সার বলে তাকে দুইবার হাসপাতালে ভর্তি করিয়েও অস্ত্রোপচার করা যায়নি। তিনি কোনো ভাতার টাকা উত্তোলন করে নেননি বলে দাবি করেন। তিনি তার বোনের বিষয়টি নিয়ে অনেক কষ্ট করে ৭৬ লাখ টাকা উত্তোলনের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কিন্তু তার মৃত ভাগ্নি লাকি বেগমের জন্য তা বাস্তবায়িত করা যায়নি। তিনি আরও জানান, মেহেরজান বেগমের স্বামীর কাগজাদি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটিতে দাখিল না করাতে বর্তমানে ভাতা বন্ধ রয়েছে। তার বোন স্বাক্ষর করলেই ভাতা উঠে। তাই তিনি মেরে খাবার প্রশ্নই উঠে না।

এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল মুনিম তরফদার জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। এ বিষয়ে কেউ তার সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হক জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।