দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম না থাকায় দিশেহারা বিয়ানীবাজার উপজেলা যুবলীগ। যত সামান্য যতটুকুই হচ্ছে তাও বিচ্ছিন্ন-বিভক্তিতে। প্রায় দেড় যুগ আগে গঠন করা আহ্বায়ক কমিটির তিন নেতার দু’জন প্রবাসে। এর মধ্যে প্রবাসের একজনসহ দেশে থাকা অন্যজনও স্থান করে নিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে। ফলে সাংগঠনিক কাজে  স্থবিরতা বিরাজ করছে। সেকারণেই স্থানীয় যুবলীগ কিভাবে চলবে, আর কারাই বা চালাবে-এ নিয়ে চলছে নানা জিজ্ঞাসা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৪ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের লীগের কমিটি গঠন করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরবর্তীতে এই কমিটির প্রতিবাদে স্থানীয়ভাবে নেতাকর্মীরা ক্ষোভ-বিক্ষোভ করেছেন। এরপর ২০০৫ সালে আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আব্দুল কুদ্দুছ টিটুকে আহবায়ক, ছফর উদ্দিন লোদী ও জুবের আহমদকে যুগ্ম আহবায়ক করে বিয়ানীবাজার উপজেলা যুবলীগের ৩ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। প্রথমদিকে অর্ন্তদ্বন্দের কারণে যুবলীগের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গতি সঞ্চার করতে পারেনি।

পরবর্তীতে যুগ্ম আহবায়ক ছফর উদ্দিন লোদী যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। একইপথ অনুসরণ করেন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান আহবায়ক আব্দুল কুদ্দুছ টিটু। এর মধ্যে ছফর উদ্দিন লোদী পুরোপুরি প্রবাসমনা হলেও সম্প্রতি গঠিত বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যুব ও ক্রীড়া বিষোয়ক সম্পাদক পদে স্থান করে নিয়েছেন আব্দুল কুদ্দুছ টিটু। এছাড়া দেশে আছেন একমাত্র জুবের আহমদ। তিনিও উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে পদ পেয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকত্বহীন রয়েছে সংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রম, নেতাকর্মীরাও যেন অনেকটা দিশেহারা। কেবলমাত্র  জাতীয় দিবসগু্লো কিংবা আওয়ামী লীগের সরকারের বিভিন্ন সাফল্য ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিভক্তভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন, র‍্যালি-শোভাযাত্রা ও কেক কর্তনের মধ্যেই সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে।

যুবলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, সিলেট জেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের পর অনেকেই আশায় ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু ২০১৯ সালে দুই শামীমের নেতৃত্বে সিলেট জেলা যুবলীগের দায়িত্ব কাঁধে উঠলেও এখনো হয়নি বিয়ানীবাজার উপজেলা যুবলীগের কমিটি। এর কারণ হিসেবে নেতাকর্মীরা সংগঠনের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে থাকা বিভক্তিকেই দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, জেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের আড়াই বছর পার হলেও এখানকার কমিটি আছে কিনা-সেই খোঁজ কেউই নেননি। এতে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনটির কার্যক্রম একদম ঝিমিয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন খোদ আওয়ামী লীগ নেতারা।

এদিকে, বিয়ানীবাজারে যুবলীগের কমিটি গঠনের অন্তরায় নিয়ে অনেকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও কেউই মুখ খুলেননি। সবাই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে যুবলীগের কমিটি গঠনের এক তরফা দাবি জানান। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় উপজেলা যুবলীগের নেতৃত্বে আসতে পারছেন না নবীনরা। এতে যেমন সংগঠনের এই শাখা গতি হারিয়ে ফেলছে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন না হওয়ায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন অনেক নেতাকর্মী। এর মধ্যে কেউ প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউবা আবার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য তদবির চালাচ্ছেন।

একটি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ জুলাই বিয়ানীবাজারে অনুষ্ঠিত উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির বর্ধিত সভায় শীঘ্রই যুবলীগের কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়। তবে জেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত এখানকার কমিটি গঠন সম্ভব হচ্ছে না বলে সভায় উপস্থিত থাকা যুবলীগের নেতাকর্মীদের জানান অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগের কেন্দ্র, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা-উপজেলা যুবলীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানান, বছর দুয়েক পূর্বে বিয়ানীবাজার উপজেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের সম্ভাব্যতা শুরু হয়েছিল। এরপর যুবলীগের মূল সংগঠন আওয়ামী লীগের স্থানীয় দুটি পক্ষের মতানৈক্যে দুটি প্রস্তাবিত কমিটি কেন্দ্রে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সমন্বয় করে কমিটি গঠনের চেষ্টা করা হলেও ‘অদৃশ্য ইশারায়’ পরিশেষে সেটাও হয়নি।

সাবেক ছাত্রনেতা কেএইচ সুমন জানান, দীর্ঘদিন উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটির দাবিতে আন্দোলন করেছি, এরপর যুবলীগেও করেছি- তবুও সফলতা পাইনি। সহযোদ্ধা অনেকেই উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। অনেকেই প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় পদপ্রত্যাশী ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। নেতৃত্বেও চলছে চরম সংকট। তিনি যুবলীগের ভাবমূর্তি রক্ষা আর সম্ভাবনাময় তরুণদের আওয়ামী রাজনীতিতে ধরে রাখতে দ্রুত উপজেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের দাবি জানান।

কমিটি গঠন করা হলে অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনগুলোর চেয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা যুবলীগ সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী এবং সক্রিয় হয়ে উঠবে-এমন দাবি যুবলীগ নেতা হানিফ মোহাম্মদ ইফতেখারের। একই কথা জানিয়ে যুবলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সময় যতই গড়াচ্ছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মাঝে দূরত্ব তত বাড়ছে। কমে গেছে সাংগঠনিক কার্যক্রমও। এতে সাধারণ কর্মীদের মাঝেও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের দাবিতে কাজ করেছেন সুহেল আহমদ রাশেদ। তিনি হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য অনেক দাবি জানিয়েছি। বার বার দ্বারস্থ্য হয়েছি জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের। কিন্তু কে শুনে কার কথা? কমিটি না থাকায় স্থানীয় যুবলীগ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনটির কার্যক্রম বাঁচিয়ে রাখতে অচিরেই কমিটি গঠনের দাবি জানান।

এ ব্যাপারে কথা হয় সিলেট জেলা আওয়ামী যুবলীগের লীগের সভাপতি শামীম আহমদের সাথে। তিনি জানান, সংগঠনের জন্য একটি উর্বর জনপদ হচ্ছে বিয়ানীবাজার উপজেলা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের এখানকার নেতাকর্মীরা দলীয় পরিচয় বহন করতে পারছেন। তিনি বলেন, জেলার অন্যান্য কমিটির চেয়ে আমরা বিয়ানীবাজার যুবলীগের কমিটি গঠনে বেশি প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি। বর্তমানে জেলা আওয়ামী যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, শেষ হলেই বিয়ানীবাজার যুবলীগের কমিটি দেয়া হবে। কমিটি গঠিত হলে কারা নেতৃত্বে আসবে- এমন প্রশ্নের জবাবে শামীম আহমদ আরও বলেন, দলের জন্য নিবেদিত, নির্যাতিত-নিপীড়িত ও ত্যাগী নেতৃবৃন্দকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।