তফশিল ঘোষণা হয়নি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের। তবুও চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীরা বসে নেই। নিজেদের নির্বাচনি মাঠ ঘোচাতে ব্যস্ত রয়েছেন বিরামহীন প্রচারণা, উঠান বৈঠকে। নির্বাচনী এসব তৎপরতা জানিয়ে দিচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আসন্ন।

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এবার বিয়ানীবাজার উপজেলা ১০টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেতে তোড়জোড় চালাচ্ছেন প্রায় অর্ধ শতাধিক সম্ভাব্য চেয়ারম্যান। তাদের ধারণা, দলের মনোনয়ন পেলেই জয় নিশ্চিত। প্রার্থীদের এমন মনোভাবের কারণে এবার আওয়ামী লীগের কয়েকটি ইউনিয়ন হাতছাড়া হওয়ার আশংকা রয়েছে।

দলের শক্ত অবস্থান কিংবা দূর্গ বলে খ্যাত এমন কয়েকটি ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় নেতাকর্মীরা বিভক্ত- যা নির্বাচনে মারাত্মক প্রাভাব পড়তে পারে। দলের পরীক্ষিতরা ছাড়াও অপেক্ষাকৃত কম পরিচিতরা  চেষ্টা-তদবির করে মনোনয়ন বাগিয়ে নিতেই বেশি মনযোগী। আর এ কারণে মাঠে শক্ত অবস্থান না থাকলেও তারা দলের কেন্দ্র ও জেলার হাই কমান্ডের সুনজরে পড়তে নানা কসরত অব্যাহত রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১০ ইউনিয়নে প্রায় অর্ধ শতাধিক নেতা রয়েছেন, যারা মনোনয়ন নিশ্চিত করতে তদবিরে ব্যস্ত রয়েছেন। তবে মাঠের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান রয়েছে, মনোনয়ন প্রত্যাশী এমন নেতার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। জেলা-উপজেলা নেতৃবৃন্দরা বলেছেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিয়ানীবাজারের তৃণমূল আওয়ামী লীগ যেসব নেতা মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন, তাদের বেশির ভাগেরই নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত নয়। কিন্তু মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে চেষ্টা ও তদবিরে পিছিয়ে নেই তারা। এই নেতারা নিজেদের অবস্থান তৈরি না করে আগেই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে চান। তাদের ধারণা, মনোনয়ন পেলেই জিতে যাবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে দলের স্থানীয় কার্যালয়, নেতাদের বাসা-বাড়ি ও ব্যবসায়িক কার্যালয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা অনেক সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, দলের মনোনয়ন পেতে অনেক কিছু মেন্টেইন করতে হয়, নির্বাচনে জেতার জন্য এত কিছু রক্ষা করতে হয় না। তাই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে আগেভাগেই তদবির করতে হয়।

জানা গেছে, আলীনগর ইউনিয়নের নৌকার মনোনয়ন চান সিলেট জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের সহ সভাপতি আহমেদুর রহমান শিশু। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল জায়গীরদার নৌকা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি পরাজিত হন। তবে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে তার কোন তোড়জোড় লক্ষ্য করা যায়নি।

গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন চারখাই ইউনিয়ন থেকে সাবেক ছাত্রনেতা মাহমদ আলী, শেওলা ইউনিয়ন থেকে আওয়ামী লীগ নেতা জহুর উদ্দিন ও দুবাগ ইউনিয়ন থেকে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস ছালাম। তারা তিনজনই এবারও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। নির্বাচিত হয়ে নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

দুবাগ ইউনিয়ন থেকে দলের মনোনয়ন চান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ব্যবসায়ী আব্দুল কাদির ও সাধারণ সম্পাদক তাওফিক মাহমুদ চৌধুরী, দুবাগ ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ছাত্রনেতা পলাশ আফজাল। একইভাবে শেওলা ইউনিয়ন থেকে নৌকা প্রতিক চান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আব্দুল বাছিত মারুফ এবং উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী মাসুদ হোসেন খান।

কুড়ারবাজার ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন চান উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ফুটবলার তুতিউর রহমান তোতা এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ।

মাথিউরা ইউনিয়ন থেকে গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন শিহাব উদ্দিন। তিনি এবারও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী। পাশাপাশি দলীয় মনোনয়ন চান উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও শহীদ পরিবারের সন্তান আলমগীর হোসেন রুনু, সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক গ্রন্থনা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আমান উদ্দিন।

তিলপাড়া ইউনিয়ন থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চান আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান এমাদ উদ্দিন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসলাম উদ্দিন এবং ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি ছায়াদ উদ্দিন।

মোল্লাপুর ইউনিয়নের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমাণ্ডার এম এ কাদির,  ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা সাব্বির হোসেন হীরা, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য দেলোয়ার হোসেন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও সাবেক ছাত্রনেতা শামীম আহমদ এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাহেল আহমদ।

মুড়িয়া ইউনিয়নে দলের সমর্থন চান মুড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল ওয়াহিদ তারেক, বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাব্বির উদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা শফিউর রহমান এবং সাবেক ছাত্রনেতা কাওছার আহমদ।

গত নির্বাচনে নৌকা প্রতিক নিয়ে লাউতা ইউনিয়ন থেকে প্রতিদ্বন্দিতা করেন সাবেক চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এমএ জলিল। তবে নির্বাচনে তাকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী গোউছ উদ্দিন। তারা দুজনেই এবার আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। এছাড়াও দলীয় মনোনয়ন চান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক ডা. পিএম পাল, আওয়ামী লীগ নেতা সার্জেন্ট তাজ উদ্দিন ও লুৎফুর রহমান ফয়ছল।

মনোনয়ন প্রত্যাশী কয়েকজন নেতা বলেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কম। ফলে দলের মনোনয়ন পাওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আবার কারও মতে, নৌকার টিকিট পেলে মাঠের অবস্থান এমনিতেই হয়ে যাবে। মনোনয়ন প্রত্যাশী বেশির ভাগ নেতার এমনই ধারণা। আবার অনেক ছাত্রনেতাই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, দল টানা ১০ বছর ক্ষমতায়। এখনই নিজেকে উপস্থাপন করার সেরা সময়। মনোনয়ন পেলে জয়ের সম্ভাবনাও বেশি। আর না পেলেও ভবিষ্যতে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। এসব কারণেই একেক ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থী চার-পাঁচজন।

এদিকে, দলের স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময়ই বলে আসছেন জাতীয় ও স্থানীয় সবকটি নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক। কোন প্রার্থীকেই বিজয়ী করার দায়িত্ব আওয়ামী লীগ নেবেন না। প্রার্থীকে নিজ নিজ যোগ্যতায় বিজয়ী হতে হবে। তাই সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় কাজ করতে হবে। জনগণের দুয়ারে যেতে হবে। শেখ হাসিনার এ কথা অনুযায়ী যারা কাজ করছেন না, তারা মনোনয়ন পাবেন না। মনোনয়ন পেতে হলে মাঠ তৈরি করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল বলেন, দলের প্রার্থী নির্ধারণ করার বিষয়ে হাইকমান্ডের নির্দেশনা রয়েছে। সে নির্দেশনা মেনে প্রত্যেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। এখানে চেষ্টা তদবীর করে মনোনয়ন বাগিয়ে নেয়ার সুযোগ নেই। তৃণমূলে যার অবস্থান সুসংহত তাকেই দলের নির্ধারীত ফোরাম মনোনীত করবে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান খান বলেন, দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী দলের দায়িত্বশীলরা নির্ধারণ করবেন। এখানে যাদের অবস্থান সুসংহত, ইউনিয়নের দায়িত্বশীলরা দলীয় ফোরামে তাদেরকে বেঁচে নেবেন। কেন্দ্রে নূন্যতম তিন জনের নাম ও জীবন বৃত্তান্ত পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে।

এবিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন-

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ : বিয়ানীবাজারে দুই দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলা সমাপ্ত