ঘুম আর জাগরণের অদ্ভুত ব্যাটিং চিটাগং ভাইকিংসের। ঠিক আগের ম্যাচের মতোই শুরুতে ভয়ঙ্কর তাণ্ডব, এরপর একদমই নিস্তরঙ্গ স্রোত। লুক রনকির হারিকেন ইনিংসে দুর্দান্ত শুরু, পরের ভাগে বাকিদের মিইয়ে যাওয়া। সেটিরই খেসারত দিতে হচ্ছিল আরও একবার। কিন্তু এক ওভারেই খেলার মোড় পাল্টে দিলেন তাসকিন আহমেদ!

রান তাড়ায় এগোতে থাকা রংপুর রাইডার্স পথ হারাল তাসকিনের বোলিংয়ে। টানা দুই বলে উইকেট নেওয়ার পর হ্যাটট্রিক করতে পারেননি এই ফাস্ট বোলার, তবে তার পা ছুঁয়ে আসা রান আউটে হ্যাটট্রিক দলের। রংপুরের আশার সমাধি। চিটাগং কিংসের জয়।

বিপিএলে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে রংপুর রাইডার্সকে ১১ রানে হারিয়ে প্রথম জয় পেয়েছে চিটাগং ভাইকিংস।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চিটাংয়ের ১৬৬ রান তাড়ায় রংপুর করতে পারে ১৫৫ রান।

আগের ম্যাচে প্রথম ১০ ওভারে ৯১ রান তোলার পর শেষ ১০ ওভারে ৫৪ তুলতে পেরেছিল চিটাগং। এদিনও প্রথম ১০ ওভারে ১১২, শেষ ১০ ওভারে ৫৪। শঙ্কা ছিল আরেকটি হারের। কিন্তু তাসকিনের ওই ওভারই পাল্টে দিয়েছে ম্যাচের ভাগ্য।

রান তাড়ায় প্রথম ওভারেই রংপুর হারায় জনসন চার্লসকে। উইকেটে গিয়ে মোহাম্মদ মিঠুন সেই ওভারেই মারেন ছক্কা।

ওপেনার হিসেবে একাদশে ফেরা জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন ছক্কা ও চারে। কিন্তু আরও একটি ছক্কার চেষ্টায় ফিরলেন ৪ বলে ১১ রান করে।

মিঠুন ও বোপারার দারুণ ব্যাটিংয়ে তবু রানের গতি কমেনি রংপুরের। দলের পঞ্চাশ আসে ৪.৩ ওভারেই। দারুণ খেলতে থাকা মিঠুনের ইনিংস শেষ হয় লুইস রিসের স্লোয়ারে বাজে এক শট খেলে (১৫ বলে ২৩)।

আগের ম্যাচে কার্যকর একটি জুটি গড়া শাহরিয়ার নাফিস এই ম্যাচেও দারুণ সঙ্গ দেন বোপারাকে। এক-দুই রানের পাশাপাশি মাঝেমধ্যেই দুজনের ব্যাটে আসছিল বাউন্ডারি। রংপুরও এগিয়ে যাচ্ছিলো জয়ের দিকে। দৃশ্যপটে আগমন তাসকিনের।

প্রায় নিখুঁত এক ইয়র্কারে এলোমেলো করে দিলেন শাহরিয়ারের স্টাম্প (২৩ বলে ২৬)। পরের বলে সামিউল্লাহ শেনওয়ারি তুলে দিলেন শর্ট মিড উইকেটে।

তাসকিনের স্পর্শেই তখন যেন সোনা ফলছে। হ্যাটট্রিক বলটিতে স্ট্রেট ড্রাইভ করলেন পেরেরা, তাসকিনের বুটে লেগে উড়ল নন-স্ট্রাইক প্রান্তের বেলস। বোপারা তখন ক্রিজের বাইরে! ৩২ বলে ৩৮ রানে ফিরলেন রংপুরের সবচেয়ে বড় ভরসা।

রংপুরের শেষ আশা আর চিটাগংয়ের বাধা ছিলেন থিসারা পেরেরা। তাসকিনের এক ওভারে দারুণ দুটি ছক্কা-চার মারলেন। কিন্তু বাউন্ডারিতে পেরেরাকে ফিরিয়ে তাসকিন নিলেন প্রতিশোধ। নিশ্চিত করে দিলেন দলের জয়।

শেষ দিকে মাশরাফি ও মালিঙ্গার ছোট দুটি ইনিংসে কমেছে ব্যবধান।

শেষের মত শুরুটাও চিটাগংয়ের ছিল দুর্দান্ত। রনকি শুরু করেছিলেন দুই ছক্কায়। মাশরাফির প্রথম ওভারে দুটি শর্ট বলে দুটি ছয়। প্রথম ওভার থেকে রান শুধু ওই দুটি ছক্কায়।

পরের দুই ওভারে বাড়ে ঝড়ের মাত্রা। দ্বিতীয় ওভারে সোহাগ গাজীকে রনকি মানের তিনটি চার। রান আসে ১৫। তৃতীয় ওভারে নাজমুল অপুর ওপর রনকি চালান তাণ্ডব। তিন ছক্কার সঙ্গে একটি চার। ওভার থেকে আসে ২৩ রান।

৩ ওভারেই চট্টগ্রামের স্কোরবোর্ডের জমা ৫০ রান। বিপিএলের সব আসর মিলিয়ে দ্রুততম দলীয় ফিফটি। সেই ৫০ রানে রনকিরই ৪৮, সৌম্য সরকার ২ বলে ২।

পরের ওভারে রনকি ফিফটি স্পর্শ করেন মাত্র ১৯ বলে, যা বিপিএলে তৃতীয় দ্রুততম পঞ্চাশ। ১৬ বলে ফিফটির বিপিএল রেকর্ড আহমেদ শেহজাদের, ১৮ বলে করেছিলেন সিকুগে প্রসন্ন।

পঞ্চম ওভারে বোলিংয়ে ফিরে জুটি ভাঙেন মাশরাফি। স্লোয়ারে ফেরান সৌম্যকে। ৫৯ রানের জুটিতে সৌম্যর অবদান ছিল ৭।

রনকির ব্যাট তবু রয়ে যায় উত্তাল। আবারও নাজমুল অপুকে সাজা দেন চার-ছক্কায়। আফগান সামিউল্লাহ শেনওয়ারিকেও দেন ছক্কার ধাক্কা।

রনকি টর্নেডো থামিয়েছেন বোপারা। দারুণ স্লোয়ারে সীমানায় ক্যাচ দিয়েছেন ৩৫ বলে ৭৮ রান করে। ৭০ রানই করেছেন বাউন্ডারিতে, ছয়-চার সমান ৭টি করে।

১০ ওভার শেষে চট্টগ্রামের রান ২ উইকেটে ১১২। এরপরই আগের ম্যাচের মতো খোলসে ঢুকে গেল তাদের ব্যাটিং।

আরেকবার ২০ রান করে ফিরলেন দিলশান মুনাবিরা। মিসবাহ-উল-হক ও লুইস রিসের ব্যাটে ঘুমপাড়ানি গান। বাউন্ডারি গেলে মিলিয়ে। এক রানকে দুই করার তাড়া নেই, বরং সম্ভাব্য কিছু দুই রান হয়ে রইল সিঙ্গেল। শেষ দিকে সময়ের দাবি মেটাতে ব্যর্থ এনামুল হক।

ঠিক আগের ম্যাচের মতোই শেষ ১০ ওভারে চিটাগং তুলেছে মাত্র ৫৪ রান। প্রথম ১০ ওভারে বাউন্ডারি ছিল ১৭টি, শেষ ১০ মোটে ১টি!

আগের ম্যাচে একই ধারার ব্যাটিংয়ে জুটেছিল পরাজয়। এ যাত্রায় চিটাগং উদ্ধার তাসকিনের সৌজন্যে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

চিটাগং ভাইকিংস: ২০ ওভারে ১৬৬/৪ (রনকি ৭৮, সৌম্য ৭, মুনাবিরা ২০, মিসবাহ ৩১*, রিস ১০, এনামুল ১৭*; মাশরাফি ১/২৮, সোহাগ ০/২৩, নাজমুল ০/৩৬, মালিঙ্গা ০/২৫, শেনওয়ারি ০/২৩, বোপারা ২/১৪, পেরেরা ১/১৬)।

রংপুর রাইডার্স: ২০ ওভারে ১৫৫/৮ (চার্লস ১, জিয়াউর ১১, মিঠুন ২৩, বোপারা ৩৮, শাহরিয়ার ২৬, শেনওয়ারি ০, থিসারা ১১, মাশরাফি ১৩, সোহাগ১১*,মালিঙ্গা ১৪*; সানজামুল ১/২১, শুভাশিস ১/৩৫, তাসকিন ৩/৩১, রিস ২/২৬, রাজা ০/১, তানবীর ০/২৪)।

ফল: চিটাগং ভাইকিংস ১১ রান জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: তাসকিন আহমেদ