বয়স ৫৫ বা ৫৬,আসল নাম মাতাব উদ্দিন । বিয়ানীবাজারের দক্ষিনাঞ্চলের মানুষের কাছে ‘জলঢুপ স্কুল’র মামু’ নামেই পরিচিত। জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয় কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসেছেন কিন্তু,’মামু’র চানাচুর খাননি-এমন মানুষের সংখ্যা হতে পারে হাতেগোনা।

পঞ্চাশোধ্ব ‘মামু’ প্রায় ৪৫-৪৬ বছর থেকে ভ্রাম্যমাণ চানাচুর ব্যবসার সাথে জড়িত। সততার সাথে স্বল্প পুঁজির ব্যবসা চালিয়ে তুষ্ট এই মানুষটি অজস্র মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পথচারীদের দৃষ্টিতে তিনি শুধু চানাচুর বিক্রেতা নন,তিনি এখন সবার ভালোবাসার সংগ্রামী মানুষও বটে। জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক সহজ-সরল ব্যক্তির উপমা এই মাতাব উদ্দিন। যদি ও এখন আর শরীল মানে না তবে নেশা আর প্রয়োজনের তাগিদে দু’পা যতদিন চলবে ততদিন তিনি এ পেশা ছাড়তে চান না তিনি।

স্থানীয়রা জানান, হাটে-বাজারের অন্যান্য ফেরিওয়ালাদের চানাচুর আর মামুর হাতের তৈরী চানাচুরের স্বাদ ক্রেতাদের কাছে কখনো সমান মনে হয় না। স্কুলের মামুর হাতে বানানো চানাচুরের স্বাদ একটু ব্যতিক্রম। সিদ্ধ চানা, কাঁচা মরিচ-নাগা মরিচ, ধনিয়া পাতা সহ প্রয়োজনীয় মসলা মিশিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে ‘মামু’ যে চানাচুর তৈরি করেন তার স্বাদ সর্বজন বিদিত। বেশির ভাগ সময়ই ক্রেতাদের ভীড় জমে থাকে স্কুলের মামুর ভ্রাম্যমান চানাচুরের দোকানে। স্বাদযুক্ত চানাচুরের খেতে ক্রেতারা পাগল প্রায় হওয়ায় মাতাব নামের এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আজ অনেকটা সফল ।

কে এই মাতাব উদ্দিন? ‘জলঢুপ স্কুলের মামু’ নামে পরিচিত মাতাব উদ্দিনের জন্ম বড়লেখা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের গল্লাসাংগন গ্রামে। ৬ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের গুরু দায়িত্ব হাতে নিতে হয় তাকে। স্কুল-মাদ্রাসায় পড়ার বয়স হলেও অভাবের তাড়নায় প্রতিবেশি এক চাচার সাথে তাকে যেতে হয় কাঠমিস্ত্রির কাজে।

প্রসঙ্গ ক্রমে মাতাব জানান,ফার্নিচার তৈরির কাজ বেশি কষ্টদায়ক হওয়ায় ২য় দিন আর এ কাজে যাননি। এরপর অন্য কাজের সন্ধানে কয়েক দিন ঘুরাঘুরি করেন। অন্য কোনো ভালো কাজের সন্ধান না পাওয়ায় প্রতিবেশি একজন চানাচুর বিক্রেতার সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সুনাই নদী দিয়ে চলাচলকারী সারপার-শান্তিবাজার লঞ্চে ঘুরেঘুরে প্রায় ১ বছর চানাচুর বিক্রি করেন। পরের বছর চান্দগ্রাম-বারইগ্রাম ফেরীতে এককভাবে চানাচুর ও ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেন মাতাব। সেতু নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত ঐ ফেরীঘাটে সততার সাথে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করেন। সেতু নির্মিত হয়ে যাওয়ায় নতুন আস্তানা হিসেবে জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয় এবং জলঢুপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী গাছতলাকে বেছে নেন তিনি। এখানে আসার পর আর পিছনে তাকাতে হয়নি থাকে।
তিনি বলেন,’যখন দেখলাম যে গাছতলায় দৈনিক ২ থেকে ৪ হাজার টাকার চানাচুর বিক্রি করতে পারছি তখন নতুন আশার সঞ্চার হয় আমার ব্যাকুল মনে। গাছতলায় ব্যবসা ভালো হচ্ছে দেখে ঐ স্থান থেকে অন্য কোথায়ও যাইনি,দেখতে দেখতে জলঢুপের গাছতলাতেই ৪০ বছর কাটিয়ে দিয়েছি।

ক্রেতারা বলছেন,’মামু’র বয়স বেড়েছে কিন্তু তার বানানো চানাচুর এবং আচারের স্বাদ একটুও কমেনি। গাড়ি বোঝাই করে যে কাঁচামাল নিয়ে আসেন তার পুরোটাই শেষ করে প্রতিদিন হাসিমুখে বাড়ি ফিরেন তিনি।