দুপুর ১২টা ৭ মিনিট। নির্ধারিত টোল পরিশোধ ও বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে প্রধানমন্ত্রী আসলেন তার গাড়িবহরে। একে একে প্রধানমন্ত্রীর বহরে থাকা গাড়িগুলো উঠতে শুরু করল প্রমত্তা পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকাণ্ড সেতুর ওপর। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ছুটে চললো জাজিরা প্রান্তের উদ্দেশে। এরই মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলো স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। দুয়ার খুলল দক্ষিণের।

এর আগে শনিবার (২৫ জুন) পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে সুধী সমাবেশে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বক্তব্য প্রদান করেন। এরপর পদ্মা সেতুর স্মারক ডাকটিকিট, স্মারক মুদ্রা, স্মারক খাম ও স্যুভেনির অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে জাজিরা পয়েন্টে পৌঁছে সেতু ও ম্যুরাল-২ এর উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন। সেখানে মোনাজাতেও অংশ নেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে এক স্বপ্নপূরণের সাফল্যগাঁথা রচিত হলো দেশের ইতিহাসে। পদ্মা সেতু নিছকই একটি সেতু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের মানুষের আবেগ, অনুভূতি। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরনির্ভরশীলতা ও পরমুখাপেক্ষিতাকে পেছনে ফেলে নিজ সক্ষমতা বিশ্বকে দেখানোর প্রত্যয়।

একসময় তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা পাওয়া দেশটি ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করে দেখাবে— এ ছিল কল্পনাতীত। সেই কল্পনা আজ বাস্তব। পদ্মাকোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা যে পদ্মা সেতু, সেটি আজ সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রমত্তা পদ্মার বুকে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার হাত ধরেই সেই মর্যাদার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

শনিবার (২৫ জুন) সকাল ১০টায় পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে আয়োজিত সুধী সমাবেশ থেকে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করছেন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার কোটি মানুষকে সরাসরি সড়কপথে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ শুরু। সেই ১৯৯৮ সালে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর উদ্বোধনের পরপরই দাবি ওঠে পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণের। তবে প্রমত্তা পদ্মাকে বাগে এনে এর বুকে ইস্পাত-কংক্রিটের কাঠামো নির্মাণ সহজ ছিল না। সেই প্রকৌশল দিক বাদ দিলেও পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়েও তৈরি হয় প্রতিবন্ধকতা।

১৯৯৮-৯৯ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ২০০১ সালের ১২ জুলাই প্রথম পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্ব চার দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি সেতু প্রকল্পের। ওয়ান-ইলেভেনখ্যাত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অবশ্য সেতুটির প্রথম প্রকল্প একনেকে পাস করা হয়। ২০০৯ সালে সেতুর নকশা প্রণয়নের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তাব। প্রথম দফায় সংসদে সেতুর ব্যয় সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।

২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়। তবে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঋণচুক্তি স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০১২ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। শর্তসাপেক্ষে এ প্রকল্পে আবার ফেরতও আসে বিশ্বব্যাংক। তবে ২০১৩ সালের ৪ মে বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তা প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা।

২০০১ সালের ১২ জুলাই প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। এরপর দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা।

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয়। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর স্প্যানে রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো শুরু হয়। সড়কপথের জন্য স্ল্যাব বসানোর কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ।

২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর সবশেষ ৪১তম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যানে পূর্ণ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট পদ্মা সেতুতে সবশেষ সড়ক স্ল্যাব স্থাপনের পর মূল সেতুতে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয় ১০ নভেম্বর।

২০২২ সালের ১৭ মে পদ্মা সেতুতে যানচলাচলের জন্য টোলের হার নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ‘পদ্মা সেতু’ নামকরণ করে সেতু বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ২৯ মে। যে শেখ হাসিনার হাত ধরে সর্ম্পণূ নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সাহস দেখিয়েছিল বাংলাদেশ, সেই শেখ হাসিনার হাতে উদ্বোধনের মাধ্যমেই আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ পরিচয়কে বিশ্বের বুকে তুলে ধরার এক চক্র পূরণ হলো আজ।