প্রবাসী অধ্যূষিত সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্তের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, স্বাস্থ্যবিধি মানতে সাধারণ মানুষের অনীহা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতা। করোনা শনাক্তের রিপোর্ট দেওয়ার পর আর কোন দায়িত্ব যেন নেই বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। ফলে এই অঞ্চলের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও ভয়াবহ হবার আশঙ্কা রয়েছে।

করোনা পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পর রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসার জন্য কি কি করতে হয়, তার কোন নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও প্রশাসন থেকে- এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অভিযোগ উঠেছে, করোনা পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসায় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ আগের মতো দায়িত্ব পালন করছে না। আগে স্বাস্থ্য বিভাগেল কর্তৃক রোগীদের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরামর্শ ও নির্দেশনা দেয়া হলে এখন করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে নিজেগৃহে চিকিৎসা নেন রোগীরা। ফেসবুক বা বিভিন্ন মাধ্যমে নির্দেশনা দেখেই তা মেনে চলছেন বলে একাধিক রোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে। এতে একদিকে যেমন হোম আইসোলেশনের নিয়ম যেমন রক্ষা হচ্ছে না, তেমনি করোনার দ্বিতীয় স্যাম্পল দিতে কিংবা তার সংস্পর্শে আসাদেরও স্যাম্পল দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে না।

করোনা পজিটিভ একাধিক রোগীর সাথে মোবাইলে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা বলেন, করোনা পজিটিভ ঘোষণা দিয়েই দায়িত্ব থেকে খালাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তাররা। কোন ওষুধ খেতে হবে, কখন খেতে হবে- তার কোন নির্দেশনা নেই। এমনকি তারা খোঁজখবরটুকুও রাখেন না। তারা বলেন, ফেসবুক ও পরিচিতদের মাধ্যমে জানতে পারি করোনা হলে কি কি করতে হয়। ফেসবুক দেখে আর পরিচিতদের দেয়া পরামর্শ নিয়ে আমরা তা পালন করছি। নিয়মিত গরম পানি, লেবুর শরবত খাচ্ছি। ভুক্তভোগীরা বলেন, ফেসবুক বা নিজেদের জানা মতো নির্দেশনায় যদি চিকিৎসা করতে হয় তাহলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এত ডাক্তার কেন?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আক্রান্ত হবার পর দ্বিতীয়বার নমুনা দিয়ে নেগেটিভ বলে গন্য করার কথা থাকলেও অনেকে ১৪দিন পর নমুনা পরীক্ষা না করেই নেগেটিভ হওয়ার ঘোষনা পান। প্রয়োজনে নেগেটিভ হওয়ায় সটিফিকেট পাওয়া গেলেও স্বাস্থ্য বিভাগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বাড়িতে এসে নেভেটিভ এর ঘোষনা বা তাদের সুসংবাদটিও দিতে আসেননা বলে জানান সদ্য পজেটিভ থেকে নেগেটিভ হওয়া ব্যক্তিরা। শুধু তাই নয়, করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে সঠিক কোন হিসেব তাঁদের কাছে পাওয়া যায় না। তবে প্রথম ২৮জন মৃতের দাফন কার্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লক্স তদারকি করলেও সর্বশেষ মৃত দেহের দাফনকার্যে উপস্থিত থাকা তো দূরের কথা, মৃতের স্বজনদের মুঠোফোনে কল দিয়েও স্বাস্থ্যবিধি মানতে উৎসাহিতকরণেরও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

গত ২২ মে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে স্যাম্পল দেন কুড়ারবাজার ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর এলাকার আয়েশা বেগম। এরপর ২৪ মে রাতে তিনি করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন বলে মুঠোফোনে একটি ক্ষুদে বার্তা পান। তিনি জানান, পজিটিভ হবার দুই দিন পর ২৭ মে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জানানো হয় তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর আর কেউ তাঁদের সাথে যোগাযোগ করেননি।

একই কথা জানান আলীনগর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের সালেহা বেগম। তিনি গত ১৯ মে স্যাম্পল দিয়ে ২১ মে রাতে পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। এর দুইদিন পর বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মুঠোফোনে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানানো হয়। এরপর দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাঁর শারিরীক অবস্থার খোজখবর কিংবা সংস্পর্শে আাসাদের স্যাম্পল পরীক্ষা করোনার জন্য বলা হয়নি।

‘আমার পরিবারের ৭/৮জন সদস্য দফায় দফায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তবে বিয়ানীবাজার সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনার পজিটিভ হবার খবর নিশ্চিত করেই শেষ, তাঁদের আর কোন দায়িত্ব নেই। আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবরও নেয়া হয়না। আর দ্বিতীয় স্যাম্পল পরীক্ষার পরামর্শ তো অনেক দূরের কথা।’ – এমন অভিযোগ দুবাগ ইউনিয়নের উত্তর দুবাগ গ্রামের করোনা রোগী ফাহমিদা আক্তারের স্বজনদের।

এদিকে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৯ মে সকালে সিলেট নগরীর মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. খালিদ উদ্দিন। জানাজার পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই দাফনকার্য সম্পাদন করেন তাঁর স্বজনরা। সেক্ষেত্রেও খবর নেয়নি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এরপর গত ২৭ মে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান বিয়ানীবাজার পৌরসভার নবাং গ্রামের সাহাব উদ্দিন। তাঁর মৃত্যুর খবরটিও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের অজানা।

স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের এমন উদাসীনতায় উদ্বিগ্ন সচেতন মহলের বাসিন্দারা। তাঁরা শঙ্কা করছেন, করোনায় আক্রান্ত এবং মৃতদের পরিচয় গোপন করে হলেও তাঁদের চিহ্নিত করা হোক। সুস্থ হবার পূর্বে যদি সকলের অগোচরে যদি করোনা রোগী ঘুরে বেড়ায় এবং স্বজনরা যদি আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের গোপনে দাফন করেন- তাহলে বিয়ানীবাজারে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

ছাত্রলীগ নেতা জাফর আহমদ বলেন, করোনা মহামারীর শুরুর দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ যেভাবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছিল এখন যেন তার বিপরীত। এভাবে যদি উদাসীনতা দেখানো হয়, তাহলে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে যাবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে ৪ জুন বিকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত এই উপজেলায় ৫৭০জন করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৩০জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৪৭২জন রোগী। এছাড়া সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতাল ও বিয়ানীবাজার উপজেলার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ৭০জন করোনা রোগী।

স্বাস্থ্য বিভাগের এই হিসেবেও রয়েছে গড়মিল। মোট ৫৭০ জন রোগীর মধ্যে ৩০ জনের মৃত্যুবরণ করলে রোগী থাকার কথা ৫৪০ জন এবং ৫৪০ জন আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৪৭২জন সুস্থ হলে চিকিৎসাধীন থাকার কথা ৬৮জন। অথচ হাসপাতালের করোনার ফোকাল টিম বলছে, সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতাল ও বিয়ানীবাজার উপজেলার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭০জন করোনা রোগী। এতে করোনায় আক্রান্ত ও সুস্থের সংখ্যা নিয়েও ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে।

এ ব্যাপারে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের করোনা টিমের নেতৃত্বে থাকা ডাঃ আবু ইসহাক আজাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি অনেকদিন থেকেই করোনার দায়িত্বে নেই তাছাড়া আমি নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে হোম আইসোলেশনে ছিলাম। সে কারণে এই ব্যাপারে আমি কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করতে পরছিনা।তবে অফিসে যোগাযোগ করলে কিংবা করোনার ফোকাল পার্সনের দায়িত্বে থাকা ডা. নয়ন মল্লিকের সাথে যোগাযোগ করলে বিস্তারিত জানতে পারবেন বলে তিনি জানান।

এরপর এই প্রতিবেদক কথা বলেন করোনার ফোকাল পার্সন ডা. নয়ন মল্লিকের সাথে। মুঠোফোনে তিনি জানান, আমরা আক্রান্তদেরকে মুঠোফোনে পরামর্শ ও তাঁদের খোঁজখবর নিয়ে থাকি। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে বলা হয় যদি কোন সমস্যা হয় তাহলে আমাদের ফোন দিতে। সিন্ধান্ত অনুযায়ী এখন এক ব্যক্তির একবার নমুনা নেয়া হবে এবং ১৪ দিন পর সে সুস্থ বলে গন্য হবে বলেও জানান তিনি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোয়াজ্জেম আলী খান চৌধুরী বলেন, আমাদের কাছে আক্রান্তদের খবর বিস্তারিত আসলেও মৃতদের খবর স্বজন কিংবা চিকিৎসাধীন হাসপাতাল থেকে না জানানোর কারণে আমরা জানতে দেরি হয়ে যায়। সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের পজিটিভ হবার খবর আসে কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাও্যাদের খবর কেন আসে না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বিষয়টি আমি বলতে পারবো না। তবে করোনার ফোকাল পার্সনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বিস্তারিত বলতে পারবেন বলে দায় এড়িয়ে যান।

এবিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন-

অষ্টম বর্ষে পদাপর্ন করলো বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রথম অনলাইন পত্রিকা ‘বিয়ানীবাজার নিউজ২৪