সবুজের সারি সারি বাগানে ঘেরা চারপাশ। পদ্মার পানি
বইছে থইথই করে। বাতাসের তরঙ্গময় দোলায়
কিচিরমিচির করে ডাকছে পাখিদের দল। বিস্তীর্ণ
মাঠের আভায় সুভাসিত এলাকা। এই গ্রামেরই এক
ছেলের নাম রাজিব। অভাবের সংসার। বাবা দিনমজুর।
কোনমতে চলে পরিবার আর রাজিব লেখাপড়া।
দিনমজুরের ছেলে হলেও লেখাপড়ায় বরাবরই
প্রথম হয় সে।এবার জে.এস.সি. তেও ও সারা
বোর্ডের মধ্যে সেরা হয়েছে। গ্রামের সবাই
তাকে এক নামে চিনে।খুবই বিনয়ী আর ভদ্র
ছেলে। কিছুদিন থেকে রাজিবের মনটা খুব খারাপ।
বাবা অসুস্থ খুবই। ঘরে খাবার নেই। এভাবে তো
আর লেখাপড়া করা যায়না। কিন্তু ছাড়াও তো যায় না। কি
করবে রাজিব? ভেবে পায় না। নাহ! আর সম্ভব না
পড়ালেখা চালানো। গ্রামের কাউকে কিছু না
জানিয়েই ঢাকা শহরে কাজের সন্ধানে ছুটে
আসে। এখানে কেউ তার পরিচিত না হওয়ায় বেশ
বেগ পেতে হয় কাজ পেতে। শেষমেশ
শ্রমিকের কাজ পায় এক মিলে। কাজ পেয়েই
বাড়িতে ফোন দেয়। ” জান মা আমি না মিলে কাজ
পাইছি। পাচঁ হাজার টাকা বেতন আর দিনে ১০০ টাকা।
আব্বুরে বলবা চিন্তা না করতে। আমি উনার চিকিৎসা
করামু। ” হাউমাউ করে কেদে উঠলেন রাজিবের
জননী। ” তুই আমগো রে না বইলা এইভাবে
যাইতে পারলি বাপ। আমরা তর খুজে কত হয়রান। ”
“কাইন্দনা মা। কি করমু? কিছুই যে করার নেই। দুয়া
কইরো। রাখলাম। ” বলেই ফোনটা রেখে দেয় রাজিব। দুই প্রান্তেই চলে কান্নার
গুনগুন আওয়াজ। যা
এই পাষাণ পৃথিবীর হৃদয় গলাতে পারে না। প্রতিদিন
কাজে যায় রাজিব । একশ টাকা থেকে খুব কষ্টে ৩০চ
টাকা মাটির ব্যাংকে জমাও রাখে। রোজা রেখে কাজ
করতে বড় কষ্ট হয় তার। কিন্তু তবুও একটা রোজাও
ছাড়তে ইচ্ছুক নয় সে। অন্য শ্রমিকরা অবাক হয়ে
যায় ওকে দেখে। কেউ রোজা ছাড়ার কথা
বললেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে রাজিব। ”
না! যত কষ্টই অউজ্ঞা রোজা ছাড়ুম না। ” কঠিন জবাব
তার। রোজা প্রায় শেষের দিকে বাড়িতে আগেই
কিছুটা টাকা পাঠিয়েছিল । কিন্তু ঈদে মা বাবাকে তো
কিছু দিতে হবে। হাতে টাকাও খুব কম। এত কম টাকায়
কি কুলোয়? ঈদের তিনদিন বাকি আছে। সেদিন কাজ
থেকে এসেই মাটির ব্যাংকটা ভেঙে ফেলে
সজিব। বাহ! এক দুই করে করে প্রায় দেড় হাজার টাকা
হয়ে গেছে। তৃপ্তির হাসি হাসে সজিব। যাক
কোনমতে ঈদটা চালিয়ে নেয়া যাবে। হঠাৎ কার
কান্নার আওয়াজ শুনা গেল। চিকন গলায় পিচ্চি মেয়েটা
তার ছোট ভাইকে বলছে, ” ভাইয়া ঈদ কি শুধু
ধনীদের জন্য। আমরা গরিবরা কি ঈদ করবো না।
ভাইয়া আমি নতুন জামা কিনবো। ভাইয়া আমি সেমাই খাব।
” মুখে কোন উত্তর নেই ছোট্ট ছেলেটির।
গাল বেয়ে শুধু অশ্রু বইছে। কি জবাব দেবে?
কিভাবেই বা শান্তনা দিবে আদরের বোনটাকে? এই
স্বার্থপর দুনিয়ার ধনীর দুলালরা যে নিজেদের
গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ব্যাস্ত।যার একটা থাকলেও আরও
তিনটা দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু এসব অসহায়
এতিমদের দিকে তাকানোর সময় নেই তাদের।
আড়ালে দাড়িয়ে সবই দেখছিল সজিব।কখন কান্নায়
তার চোখটাও ভরে উঠেছে, নিজেই জানে না।
ওরা চলে যাচ্ছিল। সজিব দৌড়ে গিয়ে পথ আটকাল। ”
তোমরা কারা? তোমাদের মা- বাবা কোথায়? “। আমরা
পথশিশু আমাদের কেউই নেই এই দুনিয়াতে।
“তোমার বোন এত কাঁদছিল কেন? ” প্রশ্ন
সজিবের। “ওসব শুনে আপনি কি করবেন? নিজের
কাজে যান। কান্নাই যে আমাদের নিত্যসঙ্গী ”
ছেলেটার সহজ জবাব। সজিবের পীড়াপীড়িতে
শেষ পর্যন্ত সবকিছু খুলে বলতে বাধ্য হয় তারা।
চোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু বয়ে যাচ্ছে ওর।
নিজে নিজে হালকা একটা হিসেব করে নেয়। মাথা
ঝাঁকিয়ে বলে। ” আচ্ছা কাল সন্ধ্যায় তোমরা এখানে
আসতে পারবে? আমি তোমাদের কাপড় আর খাবার
কিনে দেব “। ছোট্ট ভাই বোন দুটির মুখে যেন
সূর্যের হাসি ফুটে উঠে। আমাদের নিয়ে ঠাট্টা
করছেন না তো। এক ঝাপটা দিয়ে ওদের বুকে
তুলে নেয় সজিব। আলিঙন করে বলে, ” নারে
ঠাট্টা নয়।তোরা আসিস। ” হাসি মাখা মুখে ওরা চলে যায়।
সজিবের মাথায় বিরাট চিন্তা।টাকায় পোষাবে তো।
ওদিকে মা-বাবাকেও যে দিতে হবে। ঘরে এসে
শান্ত মনে হিসেব শুরু করে । বাবার লুঙি ৩০০ টাকা,
মায়ের শাড়ি ২০০ টাকা।আরও তো কত খরচ আছে।
তাছাড়া বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপার তো রইলই।
অনেকক্ষণ মাথা খুঁচানোর পরেও কিছুতেই হিসেব
মিলছেনা। মেঝেতেই শুয়ে পড়ে। ” ওহ কি করা
যায়। পরিশেষে হিসেব থেকে নিজেকেই বাদ
দিতে হল তাকে। চোখ বেয়ে তার কষ্টের
লোনাজল।” বড় সাধ ছিল জিবনের এই প্রথম নিজের
উপার্জনে ঈদ করবো। তা আর সম্ভব হলনা। চোখ
মুছে নেয় রাজিব। ঐ পথশিশুদের আনন্দের
মাঝেই নিজেকে খুজে নেয়।পরেরদিন
বিকেলেই বাবা আর মায়ের জন্য কাপড় কিনে
নেয়। সন্ধ্যায় যথারীতি ওরা হাজির।রাজিব মুচকি হাসিতে
নিজের দু:খকে লুকিয়ে ওদের সবকিছু কিনে
দেয়। সামান্য টাকা বাকি রাখে। যখনই রাজিব ওদের
বিদায় দিয়ে চলে যাবে, তখনই ওরা রাজিবের হাত
পিছন থেকে আটকে ধরে বলে, ” ভাইয়া তুমি
কোথায় যাচ্ছ? আমাদের সাথে ঈদ করবেনা! ”
রাজিবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।নিজের
মা- বাবাকে ছেড়ে অন্যদের সাথে ঈদ, কল্পনাও
করতে পারেনি। শেষপর্যন্ত ওরা রাজিবকে
জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল,”প্লিজ ভাইয়া
আমাদের কেউ নেই।আমাদের সাথে একটা ঈদ
করো না। প্লিজ প্লিজ প্লিজ।” রাজিবের চোখে
পানি আসা শুরু হল।সে ভাবল ” আমি যদি বাড়ি যাই তবে
হয়তো একটা ছেলে তার পরিবারকে পাবে আর
যদি না যাই তাহলে এই দুইটা এতিম, অনাথ, অবুঝ শিশু
তাদের এক ভাইকে পেয়ে যাবে। তাই বলে
নিজের মা-বাবাকে বিসর্জন। না না! এটা অসম্ভব। কিন্তু
এরাও যে অবুঝ এদের বুঝ দেই কিভাবে?
পরিশেষে সে সিদ্ধান্ত নিল বাড়ি যাবেনা। ফোন
দিয়ে মাকে সব খুলে বলল। তার মা কেঁদে
কেঁদে বললেন, ” বাবা তোর মত ছেলে
পেয়ে আমাদের জিবন ধন্য। তুই এক কাজ কর,
ওদের নিয়েই চলে আয়। ” রাজিবের মনটা
আনন্দে ভরে উঠল। তাকেও যে আর পরিবার
ছাড়তে হলনা।একজন রাজিব দেখিয়ে দিল কিভাবে
দরিদ্র হয়েও পথশিশুদের পাশে দাড়াতে হয়।
সমাজের বিত্তবানদের গলায় পড়িয়ে দিল অপমানের
মালা। সুখে থাকুক রাজিবরা, সুখী হোক পথশিশুরা ।।।