করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে যেসব প্রতিষ্ঠান তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে, তেমন একটি পরীক্ষায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবিতে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশি তরুণ রাহাত আহমেদ রাফি। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ভ্যাকসিন নিজের দেহে নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি।

তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় কয়েক হাজার মানুষের ওপর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে এটির কার্যকারিতা ও কতটুকু নিরাপদ, সেটা যাচাই করা হয়। রাফি বলছেন, ‘আমার ভয় লাগেনি। মানুষ তো মরণশীল, আজ হোক কাল হোক মারা যেতে হবে। এর মধ্যে মানুষের কল্যাণের জন্য যদি কিছু করতে পারি, সেটাই আমার সার্থকতা।’

চীনা কোম্পানি সিনোফার্মের সঙ্গে যৌথভাবে আবু ধাবির স্বাস্থ্য অধিদফতর ও গ্রুপ-৪২ নামের একটি কোম্পানি এই পরীক্ষা শুরু করেছে। এর আগে চীনে এই ভ্যাকসিন প্রথম ও দ্বিতীয় দফার পরীক্ষা হয়। দুইশর বেশি দেশের নাগরিক থাকায় তৃতীয় দফার পরীক্ষার জন্য আবুধাবিকে বেছে নিয়েছেন গবেষকরা।

আবুধাবি এবং আল আইন শহরে পরীক্ষায় অংশ নিতে সাত হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী নাম তালিকাভুক্ত করেছেন বলে জানিয়েছে সেদেশের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। সবমিলিয়ে ১৫ হাজার মানুষের ওপর পরীক্ষা করানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। দেশটিতে প্রথম টিকা নিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান।

তাদেরই একজন বাংলাদেশি ২৬ বছর বয়সী তরুণ রাহাত আহমেদ রাফি। তার বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়। তিনি বলছেন, ‘আমি রেডক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এখানকার করোনা টেস্টিং সেন্টারে গত দুই মাস ধরে কাজ করছি। আমার দায়িত্ব যারা টেস্ট করাতে আসবেন, তার নাম-ঠিকানা কম্পিউটারে তালিকাভুক্ত করা।’

রাফি বলছেন, ‘যখন জানতে পারলাম যে, করোনার ভ্যাকসিন পরীক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী চাওয়া হচ্ছে, তখন আমিও ইন্টারনেটে নাম তালিকাভুক্ত করি। এরপর কয়েকদিন পরে আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষা, করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়। গত ২৪ জুলাই তারিখে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়েছি। ২১ দিন পরে আবার দ্বিতীয় ডোজ দেবে।’

তিনি জানান, আবু ধাবিতে বিনামূল্যে ভ্যাকসিনের পরীক্ষায় অংশ নিতে স্বেচ্ছাসেবী চাওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ অংশ নিতে অনলাইনে আবেদন করেছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর যাদের শরীরে গুরুতর কোনো রোগ পাওয়া যাচ্ছে না, তাদেরকেই ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য বাছাই করা হচ্ছে। এদের মধ্যে স্থানীয় মানুষজনই বেশি।

ভ্যাকসিন নেওয়ার পর তার হালকা মাথা ঘোরানো ছাড়া অন্য কোন সমস্যা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে রাহাত আহমেদ রাফি।

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন দেয়ার পর থেকেই প্রতিদিন আমাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করছেন। কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না, বর্তমানে কেমন লাগছে, সেটা জানতে চাইছেন। তারা সবসময় আমাদের ফলোআপে রাখছেন। তিনদিন পরপর তাদের অফিসে গিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে বলেছেন।’

আগামী এক বছর এভাবে তাদের ফলোআপে রাখা হবে বলে আবু ধাবির স্বাস্থ্য অধিফতর থেকে ধারণা দেয়া হয়েছে। আপাতত তাকে অন্যদের থেকে আলাদা থাকার জন্য বলা হয়েছে। তিনি ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশি এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন বলে তার জানা নেই বলে জানান রাহাত আহমেদ।

জাতিসংঘের সবশেষ ২০ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন তৈরির ১৭৩টি উদ্যোগ চলছে। এর মধ্যে কয়েকটি মানবদেহে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। মূলত তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হওয়ার পর তা করোনা রোগীদের জন্য ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।

সিলেট থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হওয়ার পর গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আবুধাবিতে পাড়ি জমান রাহাত আহমেদ রাফি। সেখানে ভাইয়ের সঙ্গে মিলে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু আচমকা করোনাভাইরাস পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে রয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে থাকার সময়েও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন রাহাত আহমেদ রাফি। তাই আবুধাবিতে গিয়েও আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা রেডক্রিসেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন। প্রসঙ্গত, ভ্যাকসিনের এই পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য আর্থিক কোন সুবিধা পাওয়া যাবে না।

আবু ধাবির পত্রিকা দ্য ন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর চীনের তৈরি করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালানো হবে। ভ্যাকসিনর দুইটি ডোজ দেয়ার পর কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, সেটা বোঝার জন্য তাদেরকে কয়েক মাস ধরে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।

ইনজেকশনের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে করোনার একটি নিষ্ক্রিয় সংস্করণ ঢুকিয়ে দেয়া হবে। শরীরের ভেতর প্রবেশ করে সেটি অ্যান্টিবডি বা ভাইরাসের সাথে লড়াই করার ক্ষমতা তৈরি করবে। প্রসঙ্গত, বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশের ধারণা, মানবদেহে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হতে এই বছর পার হয়ে যাবে।

চীনের সিনোভেক বায়োটেক কোম্পানির একটি ভ্যাকসিনের পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশে নৈতিক অনুমোদন দিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল। এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষা করবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি)।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।

এবিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন-

পানিবন্দি বিয়ানীবাজারের শ্রীধরার পাখনবাসী ।।  রাস্তার অভাবে দুর্ভোগ চরমে