বীর মুক্তিযোদ্ধা বিয়ানীবাজার উপজেলার সাবেক নন্দিত চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল খালিক মায়ন ১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫১ সালে বিয়ানীবাজার থানাধীন দুবাগ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মেওয়া গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাহার পিতা মরহুম ইয়াওর আলী ও মাতা মরহুমা তইয়বুন্নেছা। পরিবারের ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ।

আব্দুল খালিক মায়ন ছিলেন বহু প্রতিভার অধিকারী, ছিলেন একজন প্রকৃতি প্রেমিক ও আবহমান বাংলার সাংস্কৃতি মনা একজন সাধা মনের মানুষ। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন। নিজ এলাকার ‘শরৎচন্দ্র পাঠশালা ‘থেকে প্রাথমিক ও ‘দুবাগ উচ্চ বিদ্যালয়’ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়া করেতে ১৯৬৭ সালে ঐতিহ্যবাহী সিলেটের এমসি কলেজে ভর্তি হন এবং সরাসরি ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

অনর্গল ও সাবলীল ভাষায় বক্তৃতা করতে পারতেন আব্দুল খালিক মায়ন। এটি ছিল রাজনৈতিক জীবনে তার একটি বড় গুণ। সেই সময় বক্তৃতা আর সাহসী নেতৃত্বের কারণে তিনি তার সহপাঠী ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মন জয় করেন, যে কারণে ছাত্রছাত্রীদের ভোটে তৎকালীন এমসি কলেজের ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন বৃহত্তর সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

যখন তিনি একজন তুখোড় ছাত্রনেতা, ঠিক তখনই পাকিস্তান সরকারের নিপীড়ন আর ঝুলুমের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান দেশ স্বাধীনের ডাক দেন এবং বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়াঁ দিয়ে মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেন। জাতির এই গর্বিত সন্তান জীবনবাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বরে সেক্টরে, মেজর জেনারেল সি.আর. দত্তের অধীনে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফিরেন।

এরপর ১৯৭২ সালে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ন হন। ১৯৭৪ সালে শেখ ফজলুল হক মনির হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগে যোগদান করেন। পরবর্তীতে আব্দুল খালিক মায়ন ১৯৭৭ সালে সিলেট আওয়ামী যুবলীগের আহবায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ধারাবাহিকভাবে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সিলেটের যে কয়েকজন আওয়ামী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন ছিলেন মরহুম আব্দুল খালিক মায়ন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মৃত্যুর পরে বলেছিলেন- ‘অনেকেই অনেক কিছুর জন্য আমার কাছে এসেছেন কিন্ত মায়ন কখনো তার নিজের চাহিদার জন্য আমার কাছে আসেননি।’

১৯৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ জাতীয় অনেক আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ছিলেন আব্দুল খালিক মায়ন। তিনি সাংগঠনিক কারণে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বহুদেশ সফর করেছেন।

এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ঘোষণা করলে তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমবার তার নির্বাচনের প্রতিক ছিল মোমবাতি প্রতীক নিয়ে পরাজিত হন। পরে দ্বিতীয়বার রিকশা প্রতীক নিয়ে উনি নির্বাচনে জনগণের ভোটে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ২৯ জানুয়ারি, ২০১১ ইং তারিখে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আব্দুল খালিক মায়ন (ইন্নালিল্লাহি…..রাজিউন)।

তার স্মরণে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী, নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপির সহযোগিতায় এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের প্রচেষ্টায় বিয়ানীবাজার-সিলেট প্রধান সড়কে মেওয়া গ্রামের ত্রিমুখী পয়েন্টে একটি চত্ত্বরের নামকরণ করা হয় (আব্দুল খালিক মায়ন চত্ত্বর)। জন্মভূমি মেওয়া গ্রামবাসীসহ পুরো বিয়ানীবাজারের মানুষ আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এই মানুষটিকে।

স্মৃতির আবরণে,
তুমি রবে নিরবে নিভৃতে নিশিতে,
হে মোদের গর্বিত সন্তান।

লেখক- সাবেক ছাত্রনেতা, বিয়ানীবাজার উপজেলা।