বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সুনামগঞ্জ জেলার কথিত প্রেমিক আব্দুল আলীম প্রেমিকাকে নিজ বাড়িতে আটকে রেখে ধর্ষণ করার ঘটনায় সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ৩১ জুলাই ধর্ষিতা বাদী হয়ে আদালতে এ মামলা দায়ের করেন। বিয়ানীবাজার সমাজসেবা কর্মকর্তাকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা পত্র  আজ সোমবার পেয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

আদালতে ধর্ষক আব্দুল আলীম, তার মামা ছাতকের খুরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিলাল আহমদ ও বিয়ানীবাজারের কুড়ারবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু তাহেরকে আসামী করে গত ৩১ জুলাই ধর্ষিতা আদালতে মামলা দায়ের করেন। এর আগে গত ১২ জুলাই ধর্ষণ ঘটনার আদালতে এজাহার দায়ের করলে আদালত মেডিকেল প্রতিবেদন জমা দেয়ার নিদের্শ দেন। পরদিন ধর্ষিতা সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজের ওসিসিতে ভর্তি হন। ৩১ জুলাই মেডিকেল প্রতিবেদন আদালতে দায়ের করলে আদালত মামলা গ্রহণ করে বিয়ানীবাজার উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ৭ মে বিয়ের কথা বলে বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে প্রেমিক আব্দুল আলীম একটি অটোরিক্সা করে প্রেমিকাকে উঠিয়ে নেয়। রাত ১০টার দিকে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ধারণ গ্রামের নিজ বাড়ির একটি কক্ষে তাকে লুকিয়ে রাখে। এভাবে ১৪দিন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আটকে রেখে তাকে ধর্ষণ করে আলীম। সে ধারণ গ্রামের আব্দুল কাহহ্ারের পুত্র। মেয়েটির বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার কুড়ারবাজার ইউনিয়নে ৭ নং ওয়ার্ডে।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, ধর্ষক প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় ধর্ষিতার পরিবারকে নানাভাবে বিষয়টি সমাধানের জন্য হুমকি ও চাপ দেয়া হয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত গত ২১ মে ধর্ষকের বাড়িতে এক শালীস বৈঠকে ধর্ষিতাকে খারাপ মেয়ে প্রমাণ করা হয়। তাকে ক্ষতিপুরণ হিসাবে ৭০ হাজার টাকা দেয়ার বিষয়টি ওই বৈঠকে নির্ধারণ করেন চেয়ারম্যান বিলাল আহমদসহ বৈঠকে উপস্থিত লোকজন। এ সময় সেখানে বিয়ানীবাজার কুড়ারবাজার ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহের উপস্থিত ছিলেন। পরে বৈঠকের নির্ধারীত ৭০ হাজার টাকা তার হাতে তুলে দেন চেয়ারম্যান বিলাল। চেয়ারম্যান আবু তাহের সঙ্গে থাকা একটি মাইক্রো করে ধর্ষিতাকে বিয়ানীবাজারে নিয়ে এসে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। এসময় তিনি টাকা দিতে গেলে ধর্ষিতা মা টাকা নেননি।

আদালতে মামলা দায়ের করার বিষয়ে মেয়েটি বলে, প্রভাবশালীরা আমার ইজ্জতের মূল্য ৭০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে। তারা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা ছেলেটির পক্ষ নেন। তিনি বলেন, গত বছর মোবাইল ফোনে তার সাথে কথা হয়। এরপর হৃদয় নেয়া-দেয়ার ঘটনা বলে। গত ৭ মে আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে বলে। তার কথা মতো আমি জিরো পয়েন্ট এলাকায় গেলে একটি অটোরিক্সায় উঠিয়ে আমাকে প্রথমে সিলেট কুমারগাও বাসস্টেশন এবং পরে সেখান থেকে বাসে করে ছাতক নিয়ে যায়। মেয়েটি বলেন, শালীস বিচারে আমাকে নষ্টা মেয়ে বলায় আমি আলীমের ঘরের একটি কক্ষে দরজা লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, শালীম বিচারে প্রভাবশালীরা আমার ইজ্জতের মূল্য নির্ধারণ করার পর জোর করে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়। আমার ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও আমাকের মারধর করে গাড়িতে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে আসেন। শালীস বৈঠকে আমি বলেছি, বিয়ের কথা বলে আলীম আমার দেহ ভোগ করেছে। হয় সে আমাকে বিয়ে করবো না হয় তার ঘরে আমি মরবো। তারা আমার কোন কথা শুনেননি।

মেয়েটির মা বলেন, ‘কুড়ারবাজার ইউপি চেয়ারম্যান তাহের গত ২০ মে রাতে এসে আমাকে বলেন, ‘‘তোমার মেয়ে সুনামগঞ্জে। তাকে গিয়ে আনতে হবে” আমি যাওয়া-আসার গাড়ি ভাড়া তার হাতে তুলে দেই। এসব ঘটনার কিছুই আমার জানা ছিল না। মেয়েটি বাড়ি আসার পর সব জানতে পারি। মামলা করার কারণে প্রভাবশালীরা আমাদের দেখে নেয়ার হুমকি দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, এসব হুমকি বিষয় উল্লেখ করে আমার মেয়ে বিয়ানীবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছে।

কুড়ারবাজার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু তাহের বলেন, মেয়েটি এক বড়ি ওজনের স্বর্ণের মালা বিক্রি করে সেখানে গিয়েছে জানার পর শালীম বৈঠকে চেয়ারম্যান বিলালসহ উপস্থিত ব্যক্তিরা স্বর্ণের দাম হিসাবে তাকে ওই টাকা দিয়েছেন। এ টাকার একটি অংশ তার আপন চাচার কাছে রক্ষিত রয়েছে। অন্যগুলো আমার কাছে আছে। আমি টাকা দিতে গেলে তারা টাকা নেয়নি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মেয়েটিকে বাজে মেয়ে বলায় আমি প্রতিবাদ করি। এ সময় শালীস বৈঠক থেকে মেয়েটি উঠে গিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরে কক্ষের দরজা ভেঙ্গে তাকে উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, সেখানে সামাজিকভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ছাতক উপজেলার খুরমা ইউপি চেয়ারম্যান বিলাল আহমদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। যার কারণে তার কোন বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বিয়ানীবাজার উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, আদালতের কাছ থেকে ধর্ষণ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশনা আজ পেয়েছি। বিষয়টি জটিল। তারপরও আদালতের সময় সীমার মধ্যেই আমি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবো। তিনি জানান, এরই মধ্যে তদন্ত কাজ শুরু করেছেন।