আজ শুনলাম গত রমজানে এক দরিদ্র পিতা সুদের টাকায় তার নববিবাহিত মেয়ের বাড়িতে বিশাল ইফতারি দিয়েছেন। ভাসুরের বউয়ের বড় ইফতারি এসেছে তাই মেয়ের বাড়ি থেকে আবদার এসেছে যেন তারও ইফতারি একটু গরম হয়: যেন গরম ইফতারি শশুর সাহেব সারা গ্রামে বন্টন করে চার পুরুষের কারো রেখে যাওয়া শরম নিবারণ করে ইজ্জত বাড়াতে পারেন। তাই নিরুপায় হয়ে ভদ্রলোক মেয়ের বিয়ের ঋণ শোধ করার পূর্বে মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে আবার ইফতারির জন্য পার্শ্ববর্তী গ্রামের দাদন ব্যবসায়ি বা সুদুড়ির আশ্রয় নিয়ে বাধ্যতামূলক ছওয়াব কামাই করলেন। আরেকজন দরিদ্র পিতা যাকাতের টাকায় মেয়ের বাড়িতে বিশাল আমকাঠালি পাঠালেন। কেননা, মেয়ের ‘মুখ রক্ষা’ করতে পাঠাতেই হবে।

আর সিলেটের প্রচলিত সামাজিক প্রথা ‘হাদা’ মানে ইউরোপ আমেরিকার ‘বেবি শাওয়ার’। বাংলাদেশে বিবাহিত মেয়ের সন্তান প্রসবের তিন/চার মাস পূর্বে আনন্দের উপলক্ষ হিসেবে মেয়ের বাড়িতে মিষ্টি-মিটাই, ফলমূলের বিশাল বহর যেতে হবে। সঙ্গে পরিবারের সকলের জন্য পোষাক। পোষাক আবার যৎসামান্য নয়, পরিবারের ছোট থেকে বড় সকলের জন্য দিতে হবে। কেউ কেউ আবার অভাবের তাড়নায় সংসারের শুধু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রদান করেন। তা নিয়ে আবার মেয়েকে সংসারের অন্যদের উগ্র কথাবার্তা বা ‘খুটা’ শুনতে হয়। আবার হাদার আনুষ্ঠানিক বা অন্য সময়ে মেয়ের বাপের বাড়ির দান বা উপহারের কাপড়গুলো নিয়েও মাঝে মধ্যে বিপত্তি বাধে। দানকৃত কাপড় কারো পছন্দ না হলে তিনি এটা অন্যকে দান করে দেন কিংবা কয়েকদিন পরে কাজের মেয়েকেও দিয়ে দেন। এতে সংসারের যে গৃহবধুর পিতৃালয় থেকে কাপড়গুলো উপহার এসেছিলো তার আত্নসম্মানে আঘাত লাগে। ফলে পারিবারিক ঝগড়া ও অশান্তির সৃষ্টিও কম হয়না। অনেক দরিদ্র পিতা মেয়ের বাড়ির চাহিদা অনুযায়ি হাদা পাঠাতে কর্জ-ধার, যাকাত বা সুদের টাকার উপর নির্ভরশীল হতে হয়। আর দরিদ্র পিতার মেয়ের জীবনে এ ধরণের নিরানন্দ আনন্দের উপলক্ষ সমাগত হলে তার বাবা আর্থিক দুরাবস্থার মধ্যে কিভাবে এতোগুলো বিষয়ের ব্যবস্থা করবেন তা ভেবে মেয়ের চোখের অশ্রু গাল বেয়ে বুক চুঁয়ে যেন পায়ের পাতা ছুঁতে উদ্যত হয়। সে তখন একমাত্র মা ছাড়া কারো কাছে তা প্রকাশও করতে পারেনা।

দরিদ্র পিতার মেয়ের জীবনে এ এক বিস্ময়কর দুঃখ জাগানিয়া অনুভূতি যা কেবল শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনাতেই যথার্থভাবে ফুটে উঠা সম্ভব। সমাজের অলক্ষ্যেই তার অবস্থান। তাই সচরাচর দৃষ্টিপাঁত হয়না। আর হলেও বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা ‘রীতি’র বিরুদ্ধে কথা বললে মানুষ আবার হাসাহাসি করে কিনা, তাই ভেবে আমরা সচেতনরাও বেমালুম চেঁপে যাই। এভাবে কিছু ‘রীতি’ বা ‘সংস্কৃতি’ অপসংস্কৃতি ও অনাচাররুপে আমাদের সমাজে ঝেঁকে বসেছে। যা ধনীদের জন্য সংস্কৃতির নামে নাম ফাঁটানো ঐশ্বর্য ও দম ফোটানো ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল পরিচায়ক বটে, অন্যদিকে গরীবের জন্য দিবানিশি দুশ্চিন্তার খোরাক, পরিবারে অশান্তি অানয়ক রাতের ঘুম হারাম করা যন্ত্রণার উপসর্গ।

সমাজে এরকম যতো জুলুমবাজ কুসংস্কার- কুরীতি ও অপসংস্কৃতি বিদ্যমান ধনীরা তার জন্য দায়ি। এটা সর্বদেশে সর্বসমাজে প্রযোজ্য। ব্যাপকাংশে ধনীর ধনীত্বের পরিচয় ঘটে বিলাসিতায়। আমাদের সমাজে যে যতো বেশি বিলাসিতা করে আমরা তাকে ততো বেশি ধনী বলে মনে করি, আবার ক্ষেত্রবিশেষে সম্মানও করি। ধনীর বিলাসিতা ও পালিত আচার গরিবকে আশাবাদি ও সংকল্পবদ্ধ করে। সেও আর্থিক অবস্থা সাপেক্ষে কোন না কোনভাবে বিত্তবানদের অনুসরণ করতে চায়, বিত্তের অনুসৃত রীতিকে ধরতে চায়। এভাবে সমাজে দিনের পরদিন কিছু সংস্কৃতি বহমান। আজ যা দৃঢ় ভিত্তির উপর দন্ডায়মান। যা নিতান্তই অপসংস্কৃতি এবং মানুষ, মানবিকতা এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর ও অকল্যাণকর বলে বিবেচনা করতেই হবে। যদি আমরা সত্যিকারেই আধুনিক হতে চাই বাহুল্য ব্যয় ও অনিষ্ট সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে হবে। আধুনিক চিন্তা-চেতনার মানে হচ্ছে জড়াগ্রস্ত-ক্ষতিকর পুরাতন সংস্কৃতি ও চিন্তার বিকল্প।

আমরা আধুনিক চিন্তা-চেতনায় আলোকিত যুবসমাজকে আহ্বান জানাই- আসুন, দেশব্যাপি অনর্থক অকল্যানকর রীতি ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জাগরণ সৃষ্টি করি। ধনী বা স্বচ্ছলদের পালিত সকল সংস্কৃতি ধারণ করা নয়, অকার্যকর আর অপব্যয়কর সংস্কৃতিকে না বলি। আসুন, সর্বাত্নক জাগরণে এ সকল অপসংস্কৃতি রোধ করে গরিবকে বাঁচাই। এটাকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রুপদান করি। যে আন্দোলনে ধনীরা হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি।

লেখক- সাবেক ছাত্রনেতা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।