১৮ই জুন, ২০১৯ ইং | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিয়ানীবাজারের রাজনীতির এক কিংবদন্তির চির বিদায়

https://i0.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2019/06/chanchol.jpg?resize=1200%2C630

‘বীর মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার মোঃ আব্দুল মুছব্বির আর নেই
চিরঋণী মোরা তোমাদের কাছে হে বীর মুক্তিযোদ্ধা’

চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার মোঃ আব্দুল মুছব্বির। বিয়ানীবাজার সরকারী কলেজের সম্ববত প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন মোঃ আব্দুল মুছব্বির আর আমার চাচা মরহুম এডভোকেট শওকত আলী। চাচার ক্লাসমেট হওয়ায় আমিও চাচা ডাকতাম। ১৯৭০ সালে বিয়ানীবাজারে হাতে গুনা মোটর সাইকেল ছিল তখন। মুছব্বির আর শফিক চাচা মটর সাইকেল চড়ে কলেজে যেতেন (হোন্ডা ৫০)। আজও মনে আছে বিয়ানীবাজার কলেজ রোড়ের কর্নারে ছমির হোটেলে বাধাই করা ওয়ালে টাঙ্গানো বেরি স্মার্ট জেমস্‌ বন্ডের মত একটা ছবির কথা, দেখতে হিরোর মত। তিনি আমাদের প্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার মোঃ আব্দুল মুছব্বির। যতবার ছমির হোটেলে যেতাম গিয়েই ছবিটার দিকে চেয়ে থাকতাম, মুছব্বির (চাচার) কথা মনে হলেই সেই সাদা কালো এই ছবিটা যেন চোখের সামনে চলে আসে। তিনি এতো আদর স্নেহ করতেন সেই ছোটবেলা থেকেই, বিয়ানীবাজার গেলেই দেখতাম ছমির হোটেলে আড্ডা দিচ্ছেন কোন কোন দিন ডেকে নিয়ে পরটা আর বাজি খাওয়াতেন। প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন আমাদের পরিবারের সাথে বেশ ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্মর্টনেস আমার ভাল লাগতো আমার বাবার মত লম্বা মোছ (গোঁফ) ছিল, ছমির হোটেলে বাধাই করা ওয়ালে টাঙ্গানো ছবিটিতে মোছের(গোঁফ)ষ্টাইল দেখতে দারুন লাগতো। খুব স্মার্ট ভাবে চলা ফেলা করতেন।

১৯৮৬ সাল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে বিয়ানীবাজার দক্ষিণ বাজারের আজির মার্কেটে সিলেট ৬ নির্বাচনী এলাকায় আমাদের শ্রীধরার শ্রদ্ধেয় সাবেক বিচারপতি জাতীয় পার্টির তৎকালিন এমপি প্রার্থী ব্যারিষ্টার এম এ হাছিব‘র নির্বাচনী জনসভায় আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির মঞ্চ ভেঙ্গে দিলে জনসভা পন্ড হয়ে যায়। তারপর মামলা হয় ৪০ জন আসামীর মধ্যে আমিও একজন ছিলাম বেদানন্দ ভট্টাচার্যের নেত্রীত্বে এডভোকেট তবারক আলী সহ প্রায় বেশ কয়েকজন আইনজীবী বিনা পয়সায় আমাদের মামলা পরিচালনা করেন।তখন উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলা চলছে সেখানে হাজিরা দেই, এই সময় মাথিউরা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাথিউরা বাজার ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত শহীদ কমর উদ্দিন মেমোরিয়েল ফুটবল প্রতিযোগিতা চলছে।মাথিউরা বাজার ক্রীড়া সংস্থা ১৯৮৬ সালের কমিটির সভাপতি আমাদের মাথিউরা পূর্বপারের মস্তফা উদ্দিন আর আমি ছিলাম সাধারণ সম্পাদক।সারা মাথিউরা ইউনিয়নের প্রতিটি মহল্লার ক্রীড়ামোদিরা এই কমিটিতে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুছব্বির আমাদের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি নিজেও একসময় ফুটবল খেলতেন। বিশ্বকাপ ফুটবল মেক্সিকো৮৬ এর লগোর আদলে শহীদ কমর উদ্দিন মেমোরিয়েল ফুটবল প্রতিযোগিতা মাথিউরা বাজার ক্রীড়া সংস্থার ৮৬ সালের লগোটি MEXICO86 এর অনুকরণ করে আমার নিজের পরিকল্পনায় নিজ হাতে তৈরি করা লগোটি মাঠের মধ্যখানে চুন দিয়ে বড় করে তৈরি করে ছিলাম MBSC86, দেখতে অনেকটা MEXICO86 এর মতো। নীচের ছবিতে লগো ২টি দেখলে অনুমান করতে পারবেন। Mathiura Bazar Sporting club ইরেজিতে সংক্ষেপে MBSC86।
.
১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের সপ্তাহ। খেলার উদ্বোধন করেছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা তৎকালিন চেয়াম্যান মুজম্মিল আলী স্যার আর সিলেট পৌর সভার সাবেক দুই দুই বারের চেয়ারম্যান এবং তৎকালিন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান বাবরুল হোসেন বাবুল প্রধান অতিথি হিসাবে ফাইন্যাল খেলায় উপস্থিত ছিলেন। বাবুল ভাই মাঠে এসেই বললেন মেক্সিকোর লগো কেন? আমি বললাম বাবুল ভাই এটা মেক্সিকোর লগো না,বিশ্বকাপ ৮৬ মেক্সিকোর অনুকরনে মাথিউরা বাজার ক্রীড়া সংস্থার লগো একটু খ্যাল করলে বুঝাবেন।খেলা চলছে মঞ্চ থেকে ধারা বিবরণী করছিলাম আমি আর মাথিউরা শেখলালের ইকবাল হোসেন (প্রয়াত)। বিরতির সময় বাবুল ভাই ইশারা দিলেন, মাইক ইকবাল মামার হাতে দিয়ে বাবুল ভাইর কাছে গেলাম তিনি আমাদের মামলার খবর জানতে চাইলেন কারণ মামালার আসামী তাঁর মামাতো ভাই কসবা বড়বাড়ির মাসুক ভাইও ছিলেন সাবেক বিয়ানীবাজার ইউপি চেয়ারম্যান।বাবুল ভাইকে মামলার সর্বশেষ খবর জানালাম, তিনি আমাকে বললেন আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় “হুন রাজনীতি এখন বাদ দিয়া পেট নীতি আগে কর ইদেশতাকি এখন বাইরা যাওগি, কে কোনবায়দি কিতা করবো দেশের রাজনীতির খবর বালা নায়। ৩০হাজার টাকা জোগাড় করো, কাইল ২হাজার টাকা লইয়া মঞ্চে তাঁর পাশে বসা আমন্ত্রিত আরেক অতিথি কুশিয়ার ট্রাভেলসের মালিক রফিক উদ্দিনকে দেখায়ে বললেন আর্জেন্ট ২/৩ দিনের মধ্যে সিলেট গিয়া পাসপোর্ট করো। সময় কম লন্ডনোর পোর্ট এন্টি খোলা আছে, ১০ অক্টোবর থাকি বন্ধ ওই যাইবো।

খেলা শেষ ছোট চাচাকে বিষয়টি বললাম পরে ছোট চাচা সম্মতি দিলেন, পর দিন থেকেই কাজ শুরু করলাম বিমানে টিকেট মিলছেনা ৮ তারিখের বৃট্রিশ এয়ারওয়েজের একটি রির্টান টিকেট ২৮হাজার টাকা দিয়ে রফিক ভাই জোগাড় করে সংবাদ দিলেন যা যা আগে বলেছিলেন সব কিছু নিয়ে আর্জেন্ট ঢাকা চলে যেতে ৮ তারিখের ফ্লাইট পর আর টিকেট নাই সংবাদ পেলাম ৬ তারিখ রাতে, বাবুল ভাইর পরিকল্পনা মোতাবেক ঢাকা থেকে পাঠানো (লন্ডনে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের একটা জরুরী চিঠি) আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সস্পাদক সাজেদা চৌধুরী কাছ থেকে এমন একটি চিঠি এসেছে (বিয়ানীবাজার পোষ্ট অফিসের সীল মোহর লাগবে বাকিটা উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় নয়) ভোর রাতে রওয়ানা দিতে হবে আমি মুছব্বির চাচার দাস গ্রামের বাসায় গেলাম বিষয়টি বললাম শুনা মাত্রই সাথে সাথে মুছব্বির চাচা রাত ১২টার দিকে পোষ্ট মাষ্টারকে ঘুম থেকে উঠায়ে রাতে বিয়ানীবাজার ডাকঘর খুলে নির্দিষ্ট তারিখের একটি সীল মোহর খামের উপরে দিয়ে দিলেন এবং আমাকে বাড়ি এনে দিয়ে গেলেন।দেশে গেলেই বাড়িতে থাকলে চাচাকে দেখে আসতাম, এইতো সেদিন দেশে গিয়ে চাচার বাড়িতে গিয়েছিলাম। ২০১৭ সালে চাচার বাড়িতে তাকে দেখতে গেলে অনেক গল্প করলাম, ছোটবেলার সাথি গিয়াস আর আমি। তাঁর বিছানা থেকে উঠায়ে একটা ছবি তুলে বলে ছিলাম, চাচা আপনার সেই ছমির হোটেলের দেয়ালে টাঙ্গানে ছবিটা আমার কাছে এত ভাল লাগতো আপনার কথা মনে হলেই সেই ছবিটা আমার চোখের সামনে আজো ভাসে। ২০১৭ সালে মুছব্বির চাচার সাথে তোলা এই ছবিটা স্মৃতি হয়ে গেল।ওপারে ভাল থাকুন বাঙালী জাতির শ্রেষ্ট সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার আমার প্রিয় চাচা শ্রদ্ধেয়  মোঃ আব্দুল মুছব্বির।

লেখক- রাজনীতিবিদ, যুক্তরাজ্য প্রবাসী।

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

সিলেট চেম্বারের নির্বাচন পরিচালনায় বোর্ড গঠন

বিয়ানীবাজারের পান্না হত্যার দায় স্বীকার করলো পাষন্ড স্বামী

বিয়ানীবাজারে রাস্তায় ধানের চারা রোপণ করে প্রতিবাদ!

বিয়ানীবাজারে তথ্য আপা প্রকল্পের উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত

বিয়ানীবাজারে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, আহত ১।। নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট

সিলেটে জাল কাগজপত্র প্রস্তুত চক্রের সদস্য র‌্যাবের হাতে আটক

ঘোষণাঃ