২১শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং | ৮ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কবি আল মাহমুদ আর নেই

https://i2.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2019/02/PicsArt_02-16-01.36.36.jpg?resize=1200%2C630

কবিতার ছন্দে ধারণ করেছিলেন ভাটি বাংলার জনজীবন। আধুনিক ভাষা কাঠামোর ভেতরে আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। ‘লোক লোকান্তরে’, ‘কালের কলস’ আর ‘সোনালী কাবিন’-এর সেই কবি আল মাহমুদ আর নেই। শুক্রবার রাত ১১টা ০৫ মিনিটে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিলো ৮৩ বছর। তিনি পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যাসহ বহু গুণগ্রাহী ও ভক্ত রেখে গেছেন।

তার পারিবারিক বন্ধু কবি আবিদ আজম খবরটি নিশ্চিত করে সমকালকে বলেন, গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে আল মাহমুদকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতালের ভর্তি করা হয়। ওইদিন রাত ৪টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে হাসপাতালেরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করেন। শুক্রবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেই অবস্থায় রাত ১১টা ০৫ মিনিটে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

আবিদ আজম জানান, আল মাহমুদ নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনি ইবনে সিনার অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার চিরায়ত জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় উপজীব্য করে তোলেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।

আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর ও মা রৌশন আরা বেগম। আল মাহমুদের প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি কুমিল্লার দাউকান্দির সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে আল মাহমুদ ঢাকায় আসেন। শুরুতে তিনি কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘কাফেলা’য় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী ‘কাফেলা’র চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক হন আল মাহমুদ। সম্পাদক থাকাকালীন সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাবরণ করতে হয় তাকে।

মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেন। ১৯৯৩ সালে পরিচালক হিসেবে শিল্পকলা একাডেমি থেকে অবসর নেন বরেণ্য এই কবি।

১৮ বছর বয়স থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকা এবং কলকাতায় কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’, ‘নতুন সাহিত্য’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘ময়ূখ’ ও ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’, যেটি তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯)- এভাবে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৯৩ সালে বের হয় আল মাহমুদের প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে – ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘আমি দূরগামী’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘উড়ালকাব্য’ ইত্যাদি। ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘ডাহুকি’, ‘আগুনের মেয়ে’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ‘পানকৌড়ির রক্ত’সহ বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ লিখে গল্পেও কিংবদন্তী হয়ে ওঠেন তিনি। এছাড়া ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ ও ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’ তার উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনীগ্রন্থ।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা রয়েছে। বছর কয়েক আগে সৈয়দা নাদিরা বেগম মারা যান। এরপর থেকে তিনি মগবাজারের বাসায় নিভৃতেই বসবাস করতেন।

সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আল মাহমুদ একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জয় বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার, জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার, কবি জসীম উদ্দিন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদকসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

সিলেটের প্রখ্যাত আলেম শফিকুল হক আমকুনীর ইন্তেকাল

বিয়ানীবাজারের সানেশ্বর সপ্রাবিতে বর্ষবরণ ও কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান

এতিম শিক্ষার্থীদের মাঝে হিউম্যান রিলিফ ফাউন্ডেশন ইউ.কে’র নগদ অর্থ প্রদান

বিয়ানীবাজারে গ্রামীণ ফোনের টাওয়ারে চুরি, দক্ষিণ সুরমা থেকে আটক ৩

গড়রবন্দ সপ্রাবি'তে স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্কুল হেলথ প্রোগ্রামের সভা অনুষ্ঠিত

বিয়ানীবাজারে যাত্রা শুরু করেছে 'ওয়ালিদাইন বস্ত্র বিতান'

ঘোষণাঃ