১৯শে মার্চ, ২০১৯ ইং | ৬ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

শহীদ নাহিদ’র প্রতি ফজলে রাব্বি সেবুল’র খোলা চিঠি

https://i2.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2019/02/khola-chiti-new.jpg?resize=1200%2C630

প্রিয় নাহিদ, ‘তুমি চলে যাওয়ার পর পৃথিবী যে কতবার সুর্যকে প্রদক্ষিণ করেছে, সুরমা-কুশিয়ারা দিয়ে কত জল গড়িয়ে বঙ্গপোসাগরে মিশেছে, কত শত বার বাশবাগানের মাথার ওপর উঠেছে ধবল পূর্ণিমার চাঁদ, কত বার দুষ্ট ছেলের দল নেচেছে প্রিয় জেমসের কনসার্টে, কত বার গ্রাম বাংলায় এসেছে নৌকা বাইচের আনন্দ, কাদামাখা মাঠে ফুটবল খেলতে গেছে কিশোর-যুবার দল, তোমার প্রিয় দক্ষিনের মাঠে হয়েছে কত শ্বাসরোদ্ধকর ক্রিকেট ম্যাচ, ওয়াজ মাহফিলের রঙ্গিন বাজার !

তোমার কি মনে পড়ে ভরা বর্ষায় ‘বাসুদেবের রথযাত্রা’…অসাম্প্রদায়িক বাংলার অন্যতম এক বর্নিল উৎসব !

আমার জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি খুব মিস করো-বাংলাদেশের শীতের সকাল, রাতের শিশির, ঢাহুকের ডাক, শরতের আকাশ, কুয়াশা ভেজা ভোর, রোদেলা দুপুর, শাপলা ফুল, দোয়েল-শালিক, মাঘের কোকিল, ছোট্ট চুডুই, আষাঢের মেঘ, বউ কথা কও পাখি, রাখালি বাশি, রূপালী ইলিশ, দূর্বাঘাসের মাঠ ,আউশের ক্ষেত, কুমডো ফুল, লাউয়ের মাচা, মায়ের উঠান!

প্রিয় নাহিদ, তুমি কি এমন মহাঅপরাধ করেছিলে যে রাষ্ট্রের বেতনভুগী পুলিশ দরিদ্র জনগণের টাকায় কেনা গুলির টার্গেট বানালো তোমার সদ্য কৌশর উর্ত্তীণ দেহটাকে? কত চোর-বাটপার, ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ ঋণখেলাপি, ধর্ষনকারী সন্ত্রাসী কিংবা সর্বনাশা জঙ্গি পুলিশের নাকের ডগায় দিব্যি ঘোরে বেডায়! অথচ গুলির নিশানা হলে তুমি!

জানি, তোমার অপরাধ- তুমি আইনের শ্বাসন এবং গনতন্ত্রে বিশ্বাস করতে, তুমি শোষনমুক্ত বাংলাদেশ গডার স্বপ্ন দেখতে। তোমার অপরাধ তুমি বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসতে, তুমি বঙ্গবন্দুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গডার সুর্যসৈনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে। তোমার অপরাধ তুমি অন্যায়ের প্রতিবাদকারী এক নির্বিক সৈনিক। তুমি শহীদ জিসি দেব আর মনু মিয়ার জাতভাই, তুমি নানকার বিদ্রোহের বিপ্লবী আত্মা। তুমি জঙ্গিবাদ আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী তরুন; তুমি জঙ্গীদের আশ্রয়দাতার চক্ষুশূল। তাই তো তোমাকেই টার্গেট করেছে ওরা ।

দুঃখ করো না প্রিয় ভাই আমার! এই দেশেরই কিছু অমানুষ তাদের জনককে স্বপরিবারে হত্যা করেছে তোমার মতো, রাষ্ট্রের টাকায় কেনা গুলির আঘাতে।

প্রিয় নাহিদ, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, ১৫ই ফেব্রুয়ারি সেই নিষ্ঠুর বিকেলে তোমার গুলিবিদ্ধ শরীর থেকে যখন অঝোর ধারায় ঝরছিল তাজা রক্ত; তখন কি শেষ বারের মত গর্ভধারিণী মায়ের প্রিয় মুখ দেখার জন্য যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছিল বুক? তোমার আদরের ছোটভাই, খেলার সাথী বোন, ওদের মায়াভরা মুখ- তোমার কি খুব মনে পড়ছিল সেই সময়? প্রিয় ভাই আমার।

প্রিয় নাহিদ তুমি জানো নাকি, তোমার সময়ের দুধের শিশুটিও এখন আর শিশু নয়- পুরোদস্তুর যুবক-যুবতি। তুমি জানো নাকি তোমার কিশোরি প্রেমিকা এখন আর লাজুক কিশোরি নয়! যার গভীর কাল চোখে তুমি খোজেছিলে সুখের ঠিকানা। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই যে নীরবে অশ্রু মোছে আচলের কোনায়।

প্রিয় নাহিদ, প্রিয় ভাই আমার- তোমার এই আত্মদান একেবারে বৃথা যায়নি। তুমি জীবন দিয়েছ তাই প্রতিক্রিয়াশীলতার বদ্ধভূমি থেকে উঠে দাড়াবার সাহস পেয়েছে বাংলাদেশ। তুমি জীবন দিয়েছ তাই বঙ্গবন্ধু কন্যা চারবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তুমি জীবন দিয়েছ তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তি হয়েছে , গঙ্গার পানি চুক্তি হয়েছে, দেশের ছিটমহলবাসীর ৭০ বছরের আহাজারির অবসান হয়েছে, বার্মার বিপক্ষে সমুদ্র বিজয় হয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার সাহস এবং সামর্থ্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তুমি জীবন দিয়েছ তাই পদ্মার বুকে প্রায় অসম্ভব সেতুটিও এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তবতা! মেট্রোরেল চালু হলে যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে ঢাকা শহর। তুমি জীবন দিয়েছ তাই শতভাগ বিদ্যুতায়িত হচ্ছে দেশ, ফলে মানুষ ভুলে যাচ্ছে ‘খাম্বা যুগের’ দুর্বিসহ যন্ত্রনার কথা। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তো এখন সময়ের ব্যাপার! তুমি জীবন দিয়েছ তাই বঙ্গবন্দুর স্বঘোশিত খুনিদের বিচার হয়েছে, ফলে জাতি আজ ইতিহাসের অভিশাপ থেকে মুক্ত, যুদ্ধাপরাধী মানবতা বিরোধী অনেকের শাস্তি নিশ্চিত হয়ে গেছে এরমধ্যে। তুমি জীবন দিয়েছ তাই মুক্তিযোদ্ধারা এখন আর রাষ্ট্রের ইচ্ছাকৃত অবহেলার পাত্র নয়। তুমি জীবন দিয়েছ তাই মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যাক্ত ভাতা, পঙ্গু ভাতাসহ যাবতীয় মানবিক এবং এশিয়ার অপরিচিত রাষ্ট্রীয় সুবিধা বাংলাদেশ নামক দরিদ্র দেশের মানুষ ভোগ করছে-ভাবা যায়!! তুমি জীবন দিয়েছ তাই বছরের প্রথম দিনেই শিশু-কিশোরদের হাতে উঠছে নতুন বই! শিক্ষকদের অমানবিক বেতন কাঠামোর অবসান হয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের গ্রহণযোগ্য ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত হয়েছে। তুমি জীবন দিয়েছ তাই সুজলা-সুফলা শ্যামল বাংলাদেশ এখনো জঙ্গিবাদের অভয়ারন্যে পরিনত হয়নি। বিদঘুটে আলখিল্লায় পুরোপোরি ভরে যায়নি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনান্দের বাংলাদেশ। তুমি জীবন দিয়েছ তাই রাজাকার কমান্ডারের গাড়িতে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা পতাকা দেখার যন্ত্রনা সহ্য করতে হচ্ছে না! তুমি জীবন দিয়েছ তাই বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে দাড়াবার স্বপ্ন দেখে।

প্রিয় ভাই আমার, তোমার এই আত্মদানে হয়ত অনেকেই অনেক কিছু পেয়েছেন। যোগ্যদের মাঝে অনেক অযোগ্য ও জায়গা করে নিয়েছে। নিয়মের মাঝে হয়ত কিছু অনিয়মও আছে। তারপরও বলি, তুমি জীবন দিয়েছ তাই বাংলাদেশ আজ জঙ্গিবাদ আর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত উন্নয়নের এক রোল মডেল!

ইতি, সেদিনের সেই সংগ্রামে ভাগ্যগুনে বেচে যাওয়া তোমার সহযোদ্ধা ভাই।

লেখকঃ- সভাপতি, শহীদ নাহিদ ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্র।

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

শামীমের ফেইসবুক স্ট্যাটাস নির্বাচনের নামে প্রহসনের রাজনীতি বন্ধ করুন

সিলেটে বেড়াতে এসে ট্রাক চাপায় সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী-ছেলে নিহত

আতাউর রহমান খান'র বাড়িতে আবুল কাশেম পল্লব!

মুড়িয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রব এর ইন্তেকাল।। বিভিন্ন মহলের শোক

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাচন- জামানত বাজেয়াপ্ত হলো যাদের

ফলাফল ঘোষণা শেষে দক্ষিণ বিয়ানীবাজারে হাজারো মানুষের বিজয় উল্লাস

ঘোষণাঃ