১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আসুন, একটু মানবিক হই।

https://i2.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2018/11/ashraful-kobir.jpg?resize=1200%2C630

‘মহিলাটা বাচিয়া আছইন, খেউ দররেবা, দরও…’ এয়ারপোর্ট রোডের মালনিছড়া এলাকায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় রাস্থায় পড়ে আছেন দুজন মানুষ। আর তাদের ঘিরে আছেন আরো অসংখ্য মানুষজন। আমি মটরসাইকেল থেকে নেমে হতভম্ব হয়ে গেলাম। এতো এতো মানুষজন, যারা সবাই বলাবলি করছেন যে একজন বেচেঁ আছেন, কিন্তু তারা কেউ আহত মানুষগুলোকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার দ্বায়িত্ব নিচ্ছেন না দেখে। সাথে সাথে আমি আমার সিদ্বান্তটা নিয়ে নিলাম। একটা মাত্র ফোন দিলাম সহকর্মী বাপ্পাদাকে। আমি ফোনে থাকা অবস্থায় রাস্তার অপর পাশে কিছু লোক গাড়ি আটকানোর চেষ্ঠা করছিল আহতদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য। কেউ রাজি হচ্ছেনা।

আমি রাস্থা পার হওয়ার সময় যে সিএনজি আটকানো হলো তার ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে হাতজোড় করে তাকে না নেয়ার অনুরোধ করছিল । এগিয়ে গিয়ে তাকে আশ্বস্থ করলাম আমি সাথে আছি এই কথা বলে। আমাকে দেখে সে রাজি হলো। ইতিমধ্যে উপস্থিত লোকজন বেশ উৎসাহি হলো এবং কয়েকজন মিলে সিএনজির কাছে নিয়ে আসলো আহত মহিলাকে।

তারপরের ঘটনাগুলো বেশ এলোমেলা। কেননা সিএনজিতে কেউ উঠতে রাজি না, তার একমাত্র কারন পুলিশি ঝামেলা। আমার কোলে আহত মহিলা।কিন্তু তার পায়ের অংশ সিএনজির বাইরে। দ্বিধাগ্রস্থ একযুবক আমতা আমতা করে বললো ,ভাই যাবোতো ঠিক আছে, কিন্তু কিনা কি ঝামেলায় পড়ি, তার কথা শেষ হওয়ার সাথেসাথে সিএনজি চালক ছেলেটা যুবকটিকে ভরসা দিল আমায় দেখিয়ে, বললো ”মামা সাংবাদিক, তাইন লগে আছইন, কোন সমস্যা আইতো নায়, আইন”। সদয় হলো যুবকহৃদয়। আমরা যাত্রা শুরু করলাম। কতক্ষণ লেগেছে জানিনা। আমি আমার শরিরে মহিলাটির রক্ত গড়ানো অনুভব করলাম।শুরু থেকেই বারবার তাকে বলছিলাম, ‘মা তোমার কিছু্ই হয়নি, মনে সাহস রাখ,এইতো আমরা হাসপাতাল চলে এসেছি’! আমি তার চোখের দিকে তাকিয়েই ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার কথা বুঝতে পারছে।। কিন্তু পথ যেন ফুরোচ্ছিল না । রাস্থায় আমরা চিৎকার করে করে সাইড নিচ্ছিলাম।।পরিস্থিতিটা কি যে ভয়াবহ তা আমি বুঝাতে পারবোনা।

একসময় আবিস্কার করলাম হসপিটালের জরুরি বিভাগের সামনে আমরা।। নামানো হলো তাকে। শুরু হলো চিকিৎসা। কিন্তু না, ডাক্তাররা জানালেন, হসপিটালে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। আমি এই কথা শুনার পর আর কিছুই ভাবতে পারিনি। আমার শরির যার তাজা রক্তে লাল,সেই মানুষটির নিথর দেহ আমি দেখার সাহস করতে পারিনি তখন। ভাবতেই পারছিলামনা মানুষটি কোনদিন কথা বলবেনা, আমি কোনদিন জানতে পারবোনা আমার স্বান্তনা কথা সে শুনেছিল কিনা, আর শুনলেও সে কি ভেবেছিল তাও জানা হবেনা আর কোনদিন!!!!

বেশ কিছুক্ষণ পর বাচ্চাগুলোকে দেখতে গেলাম স্বান্তনা দেয়ার আশায়। ছোট্র একটা মেয়ে, কি আর বয়স, সে হাউমাউ করে কাঁদছে আর বারবার মায়ের কাছে যাওয়ার আকুতি করছে। আমি পারিনি তাকে কোন স্বান্তনা দিতে! পারবোওনা!! রাতে আনেকক্ষন ছিলাম সবার অগোচরে। কিছুই ভালো লাগছিলো না। বারবার মনে হচ্ছিল আমার ছেলেমেয়েদের কথা।মনে হচ্ছিল এই ঘটনা যদি আমার সাথে হতো , তবে … ???

মন চাইলেও শরিরটা একসময় হাল ছেড়ে দিল। আমি ফিরলাম ঘরে। সারা শরিরে রক্তের গন্ধ। কাপড় ছাড়লাম। বৌ বললো পানি গরম করে দিচ্ছি। গোসল করে নাও। কিন্তু না আমি গোসল করিনি। নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল বারবার। মনে হচ্ছিল আরো কিছুক্ষন আগে যদি আসতে পারতাম…। গায়ে রক্তের গন্ধ নিয়েই রাত কাটালাম।

কাপড়ের রক্ত শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আমার মনের রক্তক্ষরণ এই জনমে শেষ হবেনা। কেননা , আমি শতশত মানুষ দেখেছি,দেখেছি অসংখ্য মোবাইলের আলো ( নিশ্চয় তারা ছবি তুলছিল) , অসংখ্য দামি দামি গাড়ি রাস্থায় দাড়ানো দেখেছি, কিন্তু সময় মতো এগিয়ে আসতে দেখিনি তাদেরকে। এসব হাতে থাকা মোবাইল গুলোর মালিক আর দামি গাড়ি গুলোর মালিক এরা আসলেই কি মানুষ ছিল ( মানবিক অর্থে) । যদি সত্যি সত্যি তারা মানুষ হতো তাহলে অবশ্যই আরেক জন মানুষের বিপদে দু হাত পেতে দিত চাওয়ার আগেই ।

তবে সব মানুষ যে সমান ছিল তা নয়, আমার আহ্বানে এগিয়ে এসেছেন অনেকেই যাদের সংখ্যা হয়তো সামান্য । এর মধ্যে সিএনজির চালক মামুন ছিলেন সবচেয়ে বেশি এগিয়ে । তিনি আসলে টাকার চিন্তা না করে পুরো সেবা মুলক মনোভাব নিয়েই হাসপাতাল পর্যন্ত ছিলেন র্দীর্ঘক্ষন । নেন নি তার পারিশ্রমিক টুকুও । পাশাপাশি কয়েকজন সহযোগীতা করেছেন গাড়ি ব্যবস্থা করে দিতে এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যাক্তির সন্তানদেরকে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন কেউ কেউ। পরবর্তী স্পটেই মারা যাওয়া ভাইয়ের মরদেহটি নিয়ে এসেছেন আরো কয়েকজন ।

যারা উক্ত ঘটনার সময় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সহযোগীতা করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন নানা ভাবে, তাদের মতো যদি আমরা প্রত্যেকেই হতাম তাহলে হয়তো বা এমন ঘনবিপদেও সহজেই আক্রান্ত মানুষেরা পেত মানবিক সহযোগীতা ..

তবে আমি এখনো বেঁচে আছি মানবিক সাহায্যে এগিয়ে আসা মানুষদের ভালবাসায় । আমি তাদের সহযোগীতায় কৃতজ্ঞ । আসুন না আমরা চেষ্টা করি একটু মানবিক হওয়ার । যে কারো বিপদে এগিয়ে যাই সামর্থ্য অনুযায়ী । এমন একটা ঘটনাতো আপনার আমার সাথেও ঘটতে পারে।

লেখক – সভাপতি, ইমজা সিলেট, সমন্বয়ক -ভূমি সন্তান বাংলাদেশ। (লেখাটি তার ৬ নভেম্বর তারিখের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া)

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

জকিগঞ্জের সন্তান ডা. মোর্শেদ সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য

কোয়াব বিয়ানীবাজার ক্রিকেট একাডেমীর উদ্বোধন অনুষ্ঠান শুক্রবার

সিলেট-০৬ আসন।। কে পাচ্ছেন বিএনপি'র ধানের শীষ

পিএসএলে খেলবেন সিলেটের জাকির!

বিয়ানীবাজারে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আগামী রবিবার

ফিরে দেখা- সংসদ নির্বাচন ২০০৮।। সিলেটের ৬টি আসনের নির্বাচনী অবস্থা

ঘোষণাঃ