২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের স্কুল কার্যক্রম

https://i1.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2018/08/UNO.jpg?resize=720%2C480

প্রাথমকি শিক্ষায় শিশুদের লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়। এই শুরুটা তার ভবিষ্যৎ জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ালেখার সুষ্ঠ পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো স্বপ্নের স্কুল কার্যক্রম। এক সময় যেখানে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা সাদামাটা ও জরাজীর্ণ কিন্তু সেই দিন আর নেই। আজ প্রতিটি বিদ্যালয় যেকোনো মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো। আর শিশুদের জন্যতো অনেক কিছ্ইু। আগে যেখানে বিদ্যালয়ে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার অভাবে শিশুরা বিদ্যালয়বিমূখ থাকতো। অনেক শিশু পরিস্ফুটিত হওয়ার আগেই ঝরে পড়তো। আজ বিদ্যালয়গুলো শিশুদের কাছে স্বপ্নের মতো। বিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে শিশুরা স্কুলকেই সবচেয়ে বেশি আনন্দের জায়গা মনে করে। এতে করে আমরা খেলার ছলে আমদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে যাচ্ছি। বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার একেবারেই কমে গেছে। আর এ সবকিছুর মূল কৃতিত্ব গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা এবং বাস্তবমূখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

‘আমার স্বপ্ন-আমার স্কুল’ এই স্লোগানেই মূলত স্বপ্নের স্কুল পরিচালিত হয়ে আসছে। এ উদ্যোগের আওতায় বছরের প্রথম দিন শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার সময় ঝগঈ’র উদ্যোগে আয়োজন করা হয় ‘শিশুবরণ’ অনুষ্ঠান। যেখানে গতানুগতিক শিক্ষায় শিশুদেরকে বেধে দেওয়া কিছু পাঠ নেওয়ার জন্য বিদ্যালয়ে যেতে হতো, আজ সেখানে শিক্ষা জীবনের প্রথম দিনটি তাদের কাটে উৎসব আনন্দের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ প্রথম থেকেই বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের একটি ইতিবাচক ধ্যান ধারণা তৈরী হতে থাকে। স্বপ্নের স্কুল কার্যক্রমে সৃজনশীল কাজে শিশুদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রকাশ করা হয় শ্রেণিভিত্তিক ‘দেয়ালিকা’ দেয়ালিকায় তাদের লেখা প্রকাশ করা হয়, যা একটি শিশুর জন্য অনেক বড় পাওয়া। দেয়ালিকায় লেখা ছাপার মাধ্যমে একটি শিশুর মেধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এটি যেমন তাদের মনে আনন্দের খোরাক জোগায় পাশাপাশি ভবিষ্যতে সৃজনশীল কাজের প্রতি তাদের আরও উৎসাহ প্রদান করে।

যেসব বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত কক্ষ রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘উপকরণ কক্ষ’। এই উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে পোস্টার পেপার, ভিপ কার্ড, গাছ পালার অংশ বিশেষ, ফল, ফুল, রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া ইত্যাদি। এগুলো ব্যবহার করে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করায় শিশুরা একদিকে যেমন ক্লাসের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, তেমনিভাবে তাদের শিখনটাও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। শিশুদের বর্ণপরিচয়ের জন্য রয়েছে সংশ্লিষ্ট বস্তু বা ছবি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যথাসময়ে হাজিরা নিশ্চিত করতে ‘বায়োমেট্রিক হাজিরা’ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব কাজের ব্যয় নির্বাহ করছেন শিক্ষক-অভিভাবক এবং স্থানীয় বিত্তশালী ব্যক্তিরা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক কাজের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে ছাত্রছাত্রীদের এবং সেই সাথে তাদের মায়েদেরকেও উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ‘খুদে ডাক্তার’, ‘স্মাইল প্রোগ্রাম’, ‘সেরা মা’ এবং ‘সেরা ছাত্রছাত্রী’ নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলার জন্য তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি শ্রেণি থেকে পাঁচজন করে মোট ১৫ জনের একটি দল হয়। তারা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের ওজন মেপে দেয় ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। তাদেরকে ‘খুদে ডাক্তার’ বলা হয়। ছোট্ট একটি শিশুকে ‘ডাক্তার’ খ্যাতিতে ভূষিত করা তার জন্য প্রেরণার বিষয়। ‘স্মাইল প্রোগ্রাম’ এ ভালো কাজের পুরস্কার স্বরূপ প্রদান করা হয় ‘স্মাইল কার্ড’। নখ কাটা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ফুল বাগানের পরিচর্যাসহ বিভিন্ন ভালো কাজে শিক্ষার্থীদের প্রতীকী এসব ‘স্মাইল কার্ড’ প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রতি তিন মাস পরপর যে বেশি কার্ড পাবে, তাকে সেরা ছাত্র নির্বাচন করা হয়। ‘সেরা মা’ নির্বচনের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের কার্যক্রমের প্রতি মায়েদের আগ্রহ বেড়ে গেছে। তারা তাদের বাচ্চাদের প্রতি আরও বেশি যতœবান হয়েছেন। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীদের সার্বিক কার্যক্রম বিবেচনা করে প্রতি বছর ‘সেরা ছাত্রছাত্রী’ নির্বাচন করা হয়। ফলে ছাত্রছাত্রীরা তাদের সৃজনশীলতা নিয়ে আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এভাবেই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্যিকার সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।

স্বপ্নের স্কুল কার্যক্রমে প্রতিটি বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় রঙে রঙিন করা হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে রয়েছে সুদৃশ্য ফটক, রয়েছে ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা তৈরী বাগান। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পড়ালেখা এবং সৃজনশীলতার আদর্শ একটি পরিবেশ আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরী করে দিচ্ছে ‘স্বপ্নের স্কুল’ কার্যক্রম।

বিয়ানীবাজার, সিলেট জেলার একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা হলেও এখানে প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্বপ্নের স্কুল কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়কে আকর্ষনীয় রঙে রাঙানো হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য মানসম্পন্ন পোশাক তৈরী করায় তা অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। স্বপ্নের স্কুল কার্যক্রমের আওতায় বাছরের প্রথম দিন স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি আয়োজন করে ‘শিশু বরণ’ অনুষ্ঠান। অনেক স্কুলে স্কুল ব্যাগ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘স্কুল গার্ডেনিং’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আকর্ষনীয় ফটক বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। শিশুর শারীরিক, মানসিক শাস্তি বন্ধের নির্দেশনা প্রদান করে মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক একটি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে যা স্বপ্নের স্কুল বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরী হচ্ছে।

স্বপ্নের স্কুল বাস্তবায়নঃ

১. অত্র উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয় আকর্ষণীয় ও রংয়ে রঙিন করা হয়েছে এর ফলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়মুখী হচ্ছে।

২. বিভিন্ন প্রতিযোগিতার (হাতের সুন্দর লেখা, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, জাতীয় দিবসসমূহে প্রতিযোগিতা, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ড কাপ প্রতিযোগিতা, শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ও আন্তঃপ্রসতাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা) আয়োজনের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় এবং বিদ্যালয়কে তারা স্বপ্নের স্থান মনে করে।

৩. অভিভাবকদের মধ্যে সেরা অভিভাবক নির্বাচন করার ফলে বিদ্যালয়ের সাথে তাদের যোগসূত্র বৃদ্ধি পায় এবং তারা বিদ্যালয়কে স্বপ্নের বিদ্যালয় হিসেবে বিবেচনা করে।

৪. এ উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত একটি শ্রেণিকে মডেল শ্রেণিতে উপনীত করা হয়েছে। এ শ্রেণির সকল কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের কাছে মডেল। স্বপ্নের স্কুল বাস্তবায়নে এ কার্যক্রম সহযোগিতা করে।

৫. এ উপজেলার প্রায় শতভাগ বিদ্যালয়ে একটি করে পৃথক উপকরণ কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আকর্ষণীয় এ উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষকগণ আকর্ষণীয়ভাবে পাঠকে উপস্থাপন করেন। ফলে শিক্ষার্থীদেও মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

আজ আমাদের ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিদ্যালয় অত্যন্ত পছন্দের একটি জায়গা। বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলায় বিপ্লব সাধিত হয়েছে। সেই সাথে পাশের হার তো বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা এই উপজেলা ঝরে পড়া রোধে অনেক এগিয়ে। যেখানে সারা দেশে ঝরে পড়ার হার কমে ১৮% এ দাড়িয়েছে, সেখানে এ উপজেলায় ১.৮২%*। বিয়ানীবাজারের মতো প্রত্যন্ত উপজেলায় এ হারই প্রমাণ করে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকার কতটা সফল।

জাতীয় অগ্রগতির প্রধান হাতিয়ার শিক্ষা। আর এ হাতিয়ারকে পুঁজি করেই উন্নত সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। (তথ্য সূত্র : উপজেলা শিক্ষা অফিস, বিয়ানীবাজার, সিলেট এর তথ্য মোতাবেক।)

লেখক : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বিয়ানীবাজার, সিলেট।

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

বিয়ানীবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী শিক্ষকের বেত্রাঘাতে আহত ।। হাসপাতালে ভর্তি

বিয়ানীবাজারে শিক্ষকের বেত্রাঘাতে শিক্ষার্থী আহত ।। অভিযোগ দায়ের

বিয়ানীবাজারে পুলিশের অভিযানে ছাত্র শিবিরের দুই নেতা গ্রেফতার

বিয়ানীবাজারে মরহুম আয়াছ আলী চৌধুরী মেধা বৃত্তি পরীক্ষা আগামী ২৫ ও ২৬ অক্টোবর

কিডনীজনিত রোগে আক্রান্ত নুর উদ্দিন'র পাশে বিয়ানীবাজার মোটর রাইডার্স

সরকার নতুন কাঠামোগত কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছে– গোলাপগঞ্জে শিক্ষামন্ত্রী

ঘোষণাঃ