১০ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আত্মপুরাণ

https://i1.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2018/07/nagri.jpg?resize=720%2C395

আমার জীবনটা এক অসফল মানুষের গল্প। তেমন কিছুই হলো না এই জীবনে। না নিজের জন্য, না দেশের জন্য; না সমাজের জন্য। কেবলই ব্যর্থতা। এর মাঝেও জীবনের সঞ্চয়ের হিসেবে বসি, ভালোভাবে যোগবিয়োগ করে দেখি, কিছু না হোক একটা কাজে তো খানিকটা সফল হয়েছি। এই নিরর্থক জীবনে এইটাই এখন সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা, বড় আনন্দের উপলক্ষ।

কয়েক বছর থেকেই লেগে আছি সিলেটি নাগরীলিপির ঐতিহ্য গৌরব পুনরুজ্জীবনের কাজে। প্রায় দশ বছরের বিরতিহীন কাজের ফল, জেগে ওঠেছে সিলেটি নাগরী। বিলুপ্ত ঐ অধ্যায় এখন আমাদের ভাষা-লিপির ইতিহাসে ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত সকল মহলে। সস্প্রতি সিলেট শহরের প্রবেশমুখ কিনব্রিজের সামনে সুরমাপয়েন্টে নির্মিত হচ্ছে ‘নাগরীচত্বর’। বাস্তবায়ন করছে সিলেট জেলা পরিষদ। চতুর্দশ শতাব্দে নাগরীলিপি চালু হয় সিলেটে। বাঙলালিপি থাকার পরও উদ্ভাবকেরা এর প্রবর্তনায় আগ্রহী হয়েছিলেন বাস্তব প্রয়োজনে। জটিল বাংলা লিপির বেড়াজাল থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় তারা সংক্ষিপ্ত এবং ধ্বনি বিজ্ঞানসম্মত একটি বর্ণমালা প্রচলন করে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ে সমর্থ হয়েছিলেন। এই লিপিতে সিলেট সংলগ্ন এলাকায় প্রায় পাঁচশত বছর চলে জীবনের পাঠ। দৈনন্দিন জীবনে যেমন ছিল মানুষের সঙ্গী, তেমনি সাহিত্যসাধনায় পেয়েছিলো মানুষের সহযোগ। শত শত গ্রন্থ, মরমি গান রচনা হয়েছে এ লিপিতে। সৈয়দ শাহনূর, শীতালং ফকির থেকে আরকুম শাহ কত মহাজন লিখেছেন তাঁদের চিন্তাজাত রচনা। এই জীবনসংশ্লিষ্ট লিপি বিগত শতকে হারিয়ে যায় আমাদের জনজীবন থেকে। এর কারণ এবং প্রেক্ষিত বেশ বড়। সিলেটের মানুষের গৌরব, বাঙালির গৌরব; বাংলা ভাষা সংস্কৃতিরই এক মহিমাময় এই লুপ্ত অধ্যায় ফিরিয়ে আনার কঠিন চ্যলেঞ্জ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম ২০০৯ সালে। লক্ষ্য ছিল একটাই নাগরীলিপির পুনরুজ্জীবন। বুকে সাহসের ভিত ছিল ঐতিহ্যবান সিলেটিদের সমর্থন। এর আগে এই অক্ষমজনের প্রচেষ্টায় সিলেটের ইতিহাসের প্রাচীন গ্রন্থগুলো জীবন পেয়েছে।

২০০৯ সালে শুরু হয় নাগরীলিপির নতুন প্রকাশনা। একের পর এক বের হয় নাগরীলিপিতে রচিত সাহিত্যের পুথি। ২০১৪ সালে বের হয় নাগরীলিপির ২৫টি পুথির একটি সম্ভার। অভাবিত সমর্থন পেয়েছি মানুষের। গত দশ বছরে দেশে বিদেশে নানা আয়োজনের মাধ্যমে ছিলাম তৎপর । দেশের প্রধান গণমাধ্যমসমূহও এসময় প্রকাশ করেছে নানা ফিচার। রেডিও টিভিতে নিয়মিভাবেই এই বিষয়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে ভূমিকা রেখেছি, কথা বলেছি। দেশে বিদেশে নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। দেশে সভা সেমিনার আয়োজন, বিনামূল্যে স্কুল কলেজে বই বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছি। জনমত তৈরীর জন্য আমরা নির্মাণ করি তথ্যচিত্র ‘নাগরী লিপির নবযাত্রা’। এটি পরিচালনা করেন বন্ধু সারোয়ার তমিজউদ্দিন। এই তথ্যচিত্রের বহূ প্রদশনী করা হয় দেশে এবং বিদেশে। আমাদের এই প্রচার প্রচারণায় উদবোদ্ধ হয়ে ফেইসবুককেন্দ্রিক প্রচারণা শামিল হয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় এবার ফিরে এসেছে নাগরী। এবার ফিরেছে ভিন্ন আঙ্গিকে, ঐতিহ্য হয়ে। একসময় যা ছিল মূর্ত, এখন অনেকটা নিথর হয়ে।

সিলেটসহ সারা দেশে, এমন কী বহির্বিশ্বেও বাংলাভাষী অধ্যুষিত এলাকায় নাগরীলিপির পুনরাবর্তন হয়েছে। সিলেটের মানুষ হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরে পেয়ে আহলাদে আটখানা। তারা রাস্তায় বের হলেই যখন দেখেন ‘নাগরীচত্বর’ জেলা প্রশাসকের অফিসের দালানে নাগরীলিপির ম্যুরাল, নাগরী পাঠশালার সাইনবোর্ড, শাড়ির দোকান কিংবা বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নামটি ‘নাগরী’, শপিং ব্যাগের হরফ হচ্ছে নাগরী কিংবা কোনো স্যুভেনিরের প্রচ্ছদে শোভা পাচ্ছে নাগরী হরফ, তখন তো গর্ভে বুক ভরে ওঠাই স্বাভাবিক। বইয়ের দোকানে থরে থরে সাজানো নাগরীলিপির বই, বাংলা একাডেমির বইমেলায় কোনো প্রকাশের স্টলে নাগরীলিপিতে সাজসজ্বা কিংবা তাদের শপিং ব্যাগে নাগরীলিপিকে কোলাজ করে দৃষ্ঠিকাড়া ডিজাইন, তখন মনতো আনন্দে নেচে ওঠারই কথা। নয় কী?

আমি তো এই স্বপ্নই দেখেছিলাম ১০ বছর আগে।

লেখক- প্রকাশক ও গবেষক।

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

বিয়ানীবাজার নিউজ২৪’র বার্তা সম্পাদক-যুগান্তর প্রতিনিধি অসুস্থ স্বপনের শয্যা পাশে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ

গোলাপগঞ্জে নৌকার সমর্থনে শিক্ষার্থী সংলাপ

'আমার নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ'- সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী

সিলেটে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ানডে ম্যাচ।। মঙ্গলবার রাত থেকে মিলবে টিকেট

বিয়ানীবাজার ক্রিকেট লীগ- ঈগলস ক্লাব খাসাড়ীপাড়াকে হারালো ঘুঙ্গাদিয়া স্পোর্টিং ক্লাব

বিয়ানীবাজার পৌর আ.লীগের সহ সভাপতি যুক্তরাজ্য প্রবাসী খছরুল হক মঙ্গলবার দেশে আসছেন

ঘোষণাঃ