২৫শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং | ১৩ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

শিকড়ের টানে বারবার ফিরে আসি আপন ভুবনে

https://i2.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2018/03/BBN24-New-NUR-LUDY.jpg?resize=720%2C395

এই তো সেদিন বছর দেড়েক আগে স্ব-পরিবারে প্রায় দুই মাস নিজের দেশ জন্ম ভূমিতে ছুটি কাঁটিয়ে আসলাম। বাবা না ফেরার দেশে চলে গেছেন অনেক বছর আগে। বাবার সাথে কথা হয় স্বপনের ঘোরে হৃদয়ে ইতারে। আর মায়ের সাথে- আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কলে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত কথা হয়। এমনকি স্বজনদের সঙ্গেও। তাহলে কেন সর্বক্ষণে দেশের জন্য মন টানে বারবার? প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে নিজেকে নিয়ে ভাববার সময় টুকু? তাহলে কি দেশের মাটিকে স্পর্শ করতে না পারার তৃষ্ণা পেয়ে যায় প্রতি নিয়ত!

” তোমারই খেলা ঘরে শিশুকাল কাটে তোমারই ধোলবালি অঙ্গে মাখি জানি ধন্য জীবন মানি ধন্য জীবন মানি ”

আসলেও তো তাই যে মাটির কাঁদা সর্বঅঙ্গে জড়িয়ে আছে, যে মাটির জন্য লক্ষ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত আর ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে একটি স্বাধীন ভূখ– তাই বুঝি এই মাটির জন্য এতো প্রেম আর ভালোবাসা।

অনিন্দ্য সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের জীবন কি এক বিচিত্রময়। শিশুকাল কাটে মাতৃকুলে, শৈশব আর কৈশোর খেলার মাঠে কাঁদা মাটিতে , যৌবনে রঙিন চশমা পরে কতো কিছু দেখতে যে মন চায়। এর মধ্যে যখন দমকা হাওয়ার মতো পরিবারের দায়িত্ব চলে আসে নিজের কাঁধে তখন সব কিছু কে বিসর্জন দিয়ে পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে সুন্দর আর সচ্ছল ভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নিজেকে জীবন যুদ্ধের সিপাহী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে জীবন যুদ্ধের পদচারণা।

কারো জীবন যুদ্ধের যাত্রা শুরু লাল সবুজের পতাকার বৃত্তে, আর কারো জীবন যুদ্ধের যাত্রা শুরু নানান দেশের রঙিন পতাকার বৃত্তে। তবে আমাদের সিলেট অঞ্চল প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা বলে পরিচিত যুগ যুগ ধরে। তাই এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একটি প্রবণতা কাজ করে বিদেশ থেকে কর্ম জীবন শুরু করতে হবে সে যেই বয়সী হউক। যাদের জীবন মাত্র শুরু তাদের চিন্তায় বিদেশে গিয়ে কাজ কর্ম করে ভবিষ্যতের জন্য অর্থনৈতিক নিশ্চিয়তা নিয়ে সচ্ছল ভাবে নতুন সংসার জীবনে যাত্রা শুরু করবে কিন্তু সেই স্বপনের সচ্ছলতার আলোর মুখ দেখার অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে এক সময় নিজের শারীরিক অসচ্ছলতা চলে আসে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে এখন যে আর আগের মতো স্বপ্ন দেখতে মন চায় না।

” যৌবনে বাজিতে জেতার জেদে নিজেকে আজ দেখে চিরকুমার। পাতাল রেলের শেষ রাতের মাতালটার মত চিৎকার করে বলে এই পৃথিবী কারাগার”

যারা অনেক দিন থেকে সংসারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন অথবা সবে মাত্র সংসারের দায়িত্ব নিজের উপর অর্পিত হয়েছে, পারিবারিক ভাবে যে উপার্জন আছে তা হয়তো বর্তমান সময়ে জন্য যথেষ্ট, তবে দিনে দিনে সংসারের সদস্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সংসারের সদস্যরা আস্তে আস্তে বড় হতে চলেছে, তাদের লেখা পড়ার খরচ থেকে শুরু করে সময় এবং সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের অনেক আবদার পূরণ করতে হয়তো বা হিমসিমি খেতে হবে ভবিষ্যতে। বৃদ্ধ মা বাবা ভাই বোন সকলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আগামী দিনে সংসারে অর্থনৈতিক বিপর্যয় যেন না আসে সেই চিন্তা থেকে একটি মানুষ যখন অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য স্বপনের প্রবাসী জীবনের মিছিলে নিজেকে যুক্ত করে নেয়। কয়জনে বা পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে দূরে ঠেলে দিতে পেরেছে, কিন্তু তিলে তিলে নিজের জীবনের বিপর্যয় চোখের সামনে দেখেছে। এখন পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে, না কি নিজের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে বুঝে উঠতে পারছে না, কারণ হিসেবের খাতায় যোগ ফল শূন্য! এখন যে বেলা পড়ে গেছে, দুপুরের সূর্যের তাপের স্বাদ আর উপভোগ করার সময় মন আর তন কোনো ঠাঁই আর নেই। সূর্য এখন আকাশের পশ্চিম দিকে অস্তমিত হতে চলেছে, মনে আর যৌবনের সেই উত্তাল নেই, শরীরে বহু রোগে বাসা বেঁধেছে জীবনের সন্ধ্যা হয়ে গেছে, দিনের আলো দেখার আর সুযোগ নেই সামনে অন্ধকার রাত্রি অপেক্ষমান , কখন যে সৃষ্টি কর্তার কাছে যাওয়ার জন্য ডাক পড়বে।

মনে পড়ে বাউল সাধক আব্দুল করিমের সেই বিখ্যাত লাইনটি
“চলিতে চরণ চলে না/ দিনে দিনে অবস হই/ আগের বাহাদুরী এখন গেল কই”

বেশ কয়েক বছর ধরে স্ব-পরিবারে ব্রিটেনে প্রবাসে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছি। বলতে পারি মোটামুটি জীবন যাত্রা ভালোই চলছে , এই যে গাড়ি-বাড়ি, পরিবার পরিজন সবকিছু থাকার পরেও কেন যেনো মনে হয় কিছুই নেই, নিঃসঙ্গ। জীবনের অনেক গুলি শীত ও বসন্ত কাটিয়ে দিলাম প্রবাসের মাটিতে। তবুও যেনো এ মাটিকে আপন করে নিতে পারলাম না। কেনো যেন মনে হয় প্রবাসের এই মাটিতে কোন প্রেম নেই, কোন ভালোবাসা নেই, আছে শুধু নিষ্ঠুরতা। হৃদয়ে অনুভব করি সকল ভালোবাসা সেই মাটিতে যেখানে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অম্লান হয়েছিল।

” আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”

এই ভালোবাসায় লুকিয়ে আছে হারাবার ভয়, এ ভালোবাসার মাটিতে যখন চির নিদ্রায় শায়িত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, তাই সজ্ঞানে এ মাটির মমতাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করি বারবার , জানিনা কেন শত চেষ্টা করেও ভুলে থাকতে পারিনি একবার। তবুও শিকড়ের টানে বারবার কেন ফিরে আসি এই ধান সিঁড়িটির তীরে, কেন এই বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে?

যে প্রবাসের মাটিকে মুহূর্তের জন্যও মন থেকে ভালোবাসতে পারলাম না স্বার্থপরের মতো , সেই প্রবাসের মাটিতেই অপরিচিত মানুষের সাথে অনন্তকালের জন্য পরকালের যাত্রা শুরু হবে। জীবন জীবিকার সবকিছু থাকার পরেও কেন যেন এক দৈন্যতা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। তবে কি এ যাত্রা স্বেচ্ছায় নয়, মেনে নেওয়া নিয়তির নিষ্ঠুরতা।

খোলা আকাশে নিচে পূর্ণিমা রাতে বজ্রকন্ঠে বলতে ইচ্ছে হয়
” এ জীবন অর্থহীন ”

লেখক- যুক্তরাজ্য প্রবাসী, সাবেক শিক্ষার্থী- বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ।

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

সুরমা নদীতে অজ্ঞাত মহিলার লাশ

সংবাদ সম্মেলনের একটি অংশের প্রতিবাদ জানিয়েছেন সুপাতলার সুভাষ দাস

গোলাপগঞ্জের চারটি সড়কের সংস্কার কাজের উদ্বোধন করলেন শিক্ষামন্ত্রী

সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী মনজ্জির আলী- নিজের জমি সংস্কার করতে গিয়ে হামলা-মামলার শিকার হয়েছি

যুবলীগ নেতা এড. আব্বাছের শয্যাপাশে শিক্ষামন্ত্রী।। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নির্দেশ প্রদান

বিয়ানীবাজার পৌর বাস টার্মিনালের ভূমির দখল হস্তান্তর

ঘোষণাঃ