১০ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

শহীদ কন্যা স্বাধীন সুন্দরীর নামেও হাত দেয় দেশদ্রোহীরা

https://i2.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2018/03/beanibazar-news-24-sadin-sundory.jpg?resize=720%2C395

স্বাধীন সুন্দরীদের বাড়ি গিয়েছিলাম হাবিবের সাথে। স্বাধীন সুন্দরী -এই নামটা যেন অন্য ধরনের। তা আসলেই সম্পূর্ন অন্য ধরনের। এই মেয়ের নাম “স্বাধীনসুন্দরী ” রেখেছিলেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। প্রশ্ন থেকে যায় মেয়েটির নাম মুক্তিযোদ্ধারা রাখবেন কেন! তার তো আপন জনদের অনেকেই ছিলেন- যারা তার নাম করণের প্রকৃত পক্ষে হক্কদার বা দাবীদার। এখানে, এই ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা কেন, হেতুটা কি? হেতু একটা আছে, অবশ্যই আছে, নিশ্চয়ই আছে।

জন্মের প্রায় মাস চারেক পূর্বেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে – স্বাধীন সুন্দরী তার পিতাকে হারিয়ে পিতৃহীন হয়ে যায়। এই জন্মে সে তার পিতাকে মানসচক্ষে দেখতে পারলেও চর্মচক্ষে দেখেনি, দেখার সুযোগ পায়নি। পিতার কথা শুনেছে তার জন্মদাত্রী মায়ের মুখ থেকে; দাদী, ফুফর, চাচা, নানী, খালা, মামা, পাড়া-পড়শীর এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মুখের জবানি থেকে। তার জন্মদাতা পিতা ছিলেন বাঙালী জাতির একজন গর্বিত সন্তান -শহীদ জামাল উদ্দিন ।
একাত্তরের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোষর কুলাঙ্গার রাজাকারেরা ধরে নিয়ে তুলে দেয় তাদের প্রভু পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন গন্ডলের নিকট। পরিণতীতে যা হবার তা-ই হয়। হানাদারদের রাইফেল থেকে ছোঁড়া তিন তিনটি প্রানঘিতী বুলেট জামাল উদ্দিনকে পাঠিয়ে দেয় পরপারে।

শহীদ জামাল উদ্দিন ছিলেন মুক্তযোদ্ধাদের গুপ্তচর বা স্পাই। দেশের ভিতরে অবস্থান করে তিনি কাজ করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে। তাঁর দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করেই মুক্তিযোদ্ধারা রাতের এসে “সড়ক ভাংনী “ব্রীজ ধ্বংস করে নির্বিঘ্নে ভারতে চলে যেতে সক্ষম হন। রাজকার কর্তৃক ব্রীজ প্রহরার যাবতীয় খুঁটিনাঁটি বিষয় বিস্তারিত জানান এবং পথও বাৎলে দেন কোন পথে মুক্তিযোদ্ধারা সহজে ব্রীজের গোড়ায় এসে কাজ সেরে ফিরে যেতে পারবেন নিরাপদে।
ব্রীজ ধ্বংসের পর জামাল উদ্দিন এলাকায় অর্থাৎ শত্রু কবলিত দেশের ভিতর অবস্থান করা নিজের পক্ষে নিরাপদ মনে করলেন না। এমনিতেই মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে তিনি ছিলেন স্বধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল বদর ও পাকি দালালদের বিষ নজরে। পাকিস্তানীরা জানতে পেরেছিলো তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গুপ্তচরের কাজ করছেন। তাই পাকিরা সম্ভবত জুন মাসের প্রথম দিকে জামাল উদ্দি কে ধরে দেবার জন্য তাঁর এলাকায় পুরষ্কার ঘোষণা করে। পুরষ্কারের মূল্য ছিলো তৎকালীন পাকিস্তানী মুদ্রায় দশ হাজার টাকা। এই সব বিবেচনায় নিয়ে ব্রীজ ধ্বংসের পরদিন সকাল বেলা পালিয়ে ভারতে যাবার পথে স্হনীয় রাজাকারদের হাতে আটকা পড়ে যান। এবং আটকা পড়ার পরের দিন পাকি হার্মাদদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হয়ে অমরত্ব লাভ করেন। এ বাবদে শহীদের মেয়ের নামকরণের অঘোষিত ছাড়পত্র পেয়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধারা। স্বাধীন সুন্দরীর জন্মের পর মুক্তিযুদ্ধারা তার বাড়ি গিয়ে বাছাই করে হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ নিংড়ে এনে রাখলেন আবেগ আপ্লুত নাম -স্বাধীন সুন্দরী । মুক্তিযুদ্ধারা মেয়েটির নাম স্বাধীন সুন্দরী রাখলে – তার আপন জনেরা কেউই কোনো আপত্তি তোলেননি বরং খুশী হয়েই মেনে নিলেন।
বছর কয়েক পূর্বে আরো একজন মুক্তিযুদ্ধের গবেষককে সঙ্গ দিতে হয়েছিলো বেশ কয়েক দিন, দিন রাতের ঠিকায়। সেই ব্যক্তি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের উপর গবেষণা সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরষ্কার প্রাপ্ত গবেষক বন্ধুবর তাজুল মোহাম্মদ। এই ধরনের বিষয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে যাওয়া যে কতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার তা সেই সময় হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেয়েছি। তাজুল মোহাম্মদ ও আমার মাথার উপর অনেক বিপদ বালাই যা- মনে পড়লে শরীর এখনো শিউরে উঠে ভয়ে, ত্রাসে। একদিন তো নির্ঘাত মৃত্যুর কবল থেকে বেঁচে যাই কপাল গুণে, ভাগ্য সুপ্রশন্ন থাকায়।

শহীদ জামাল উদ্দিনের বড়বোন আয়নুর বিবি, ছোটভাই কামাল উদ্দিন ও হাবিবের আলাপচারিতা থেকে অনেক অজানা কথা জানা গেলো। আগে যা জানতাম তা ছিলো আংশিক এবং ভাসাভাসা। এবার ভাই ও বোনের নিকট থেকে বিস্তারিত জানা হলো । যেমন -জামাল উদ্দিনকে কারা, কখন, কোথা থেকে, কি করে আটক করেছিলো। আটক করার পর তাঁকে কোথায়, কাদের প্রহরায় রাখা হয় এবং রাজাকার ও প্রহরারতরা তাঁর উপর কি কি ধরনের অত্যাচার করেছিলো। শহীদ জামাল উদ্দিনকে দেখতে যাওয়া তাঁর মাতা, ভগ্নি ও অন্যান্যদের সাথে কি রূপ আচরণ করা হয়েছিলো ইত্যাদি অনেক কিছু। এই সব বিষয় লেখার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু সব কিছু লিখতে গেলে লেখার পরিসর অনেক বড় হয়ে যাবে – তাই অন্যদিন অন্য আরেক লেখায় বিস্তারিত লেখার বাসনা রইলো। আজ কেবল স্বাধীনতা যুদ্ধে পিতা হারানো কন্যার কথা যতোটুকু সম্ভব লিখেই ইতি টানবো।

বলছিলাম স্বাধীন সুন্দলীর কথা। সে তার পিতাকে কখনো চোখে দেখেনি। পিতারমৃত্যুকালে সে ছিলো তার জননীর গর্ভে, ভ্রুনাবস্থায়। পিতার ছবি দেখার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে তার পিতার অবয়ব বা চেহারা সুরৎ সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখতো না, জানতো না -তার পিতা দেখতে কেমন ছিলেন। স্বাধীন সুন্দরী তার পিতার ছবি দেখতে পায় তার জন্মের অনেক দিন পর, সম্ভবত এক যুগ পর। তাকে তার বাবার ছবি দেখিয়ে ছিলেন তার বড় চাচা বিলেত প্রবাসী বাহরাম উদ্দিন প্রবাস থেকে বাড়ি আসার পর।

একদিন সকাল বেলা বাহরাম উদ্দিন ভাইঝিকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন -মাগো আজ তোকে এমন একটা কিছু দেখাবো যা তোর নিকট অমূল্য এক সম্পদ। ভাইঝি বললো- তবে দেখান। চাচা খুবই নরম সুরে বললেন – এখন নয় রাতে, তোর পড়ালেখা শেষ হবার পর ।

রাতে বাহরাম উদ্দিন ভাইঝিকে নিয়ে গেলেন নিজের শোবার ঘরে । বিছানায় বসালেন খুব যতœ করে। আলমিরা থেকে বের করে আনলেন তার ওয়ালেট । ওয়ালেট হাতড়ে খুঁজে বের করলেন পাসপোর্ট সাইজের সাদাকালো এক খানা পুরানো ছবি। ছবি খানা শহীদ জামাল উদ্দিনের তরুন বয়সের। এই ছবি খানাই ছিলো -মেয়ের নিকট পিতার, স্ত্রীর নিকট স্বামীর, মায়ের নিকট পুত্রের এবং ভাই বোনদের নিকট পরপারে চলে যাওয়া ভাইয়ের একমাত্র স্মারক চিহ্ন । ছবি খানা বাহরাম উদ্দিন স্বাধীন সুন্দরীর সামনে মেলে ধরে বললেন -দেখ তো মা, চিনতে পারিস কি না? বাহরাম উদ্দিন ভাইঝির জবাবের প্রত্যাশা না করেই আবেগ তাড়িত বেদনাতুর কন্ঠে উচ্চারণ করলেন -আমার আদরের ভাই, তোর বাবা । আমার প্রাণের টুকরো ভাই বলেই ভাইঝিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন অঝোরে। পাকি হানাদাররা যখন বাহরাম উদ্দিনের ছোট ভাইটিকে হত্যা করে তিনি তখন ছিলেন বিলেতের লন্ডন শহরে। ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শোনে ভাই শোকে শোকাতুর বাহরাম উদ্দিন নাকি বেশ কিছু দিন অপ্রকৃতিস্থ অবস্হায় ছিলেন।

আয়নুর বিবি তার শহীদ ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন বার বার, কথা বলতে পারছেন না ভালো করে। এমনটাই স্বাভাবিক সহোদর ভাইয়ের শোক সহোদরা বোনের পক্ষে ভুলে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। তা-ও আবার ছোট ভাই, যাকে কোলে কাঁখে করে মানুষ করেছেন আদর সোহাগ দিয়ে। ফুফুর বুক ভাঙ্গা কান্না দেখে ভাইঝি স্বাধীন সুন্দরী নির্বাক তাকিয়ে আছে ফুফুর মুখের দিকে। তার বেদনা কাতর চোখ দুটি চুয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়ছে বেদনাশ্রু। তার সমস্ত অবয়ব জুড়ে দুঃসহ এক যন্ত্রণার ছাপ। সে মাঝে মাঝে আমার ও হাবিবের দিকে তাকাচ্ছে আর শাড়ীর আচলের খুঁট দ্বারা তার চোখের কোণার অশ্রু মুছে নিচ্ছে। আমি স্বাধীন সুন্দরীকে অবলোকন করছিলাম আর ভাবছিলাম জনম দুঃখী এই মেয়েটির কথা। তার জীবনের আফসোসের কথা। তার মনের কষ্টের কথা। সে তার বাবাকে নয়ন ভরে দেখলো না কখনো। কখনো বাবার কোলে বসে দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরে বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারলোনা। জীবনে পেলোনা বাবার একটুও আদর, সোহাগ, স্নেহ, মায়া, মমতা আর ভালোবাসা। জীবনে শুনতে পেলোনা বাবার কন্ঠের সুমধুর মা মনি ডাক।

স্বাধীন সুন্দরীর জীবনে বেজায় রকমের বেদনাদায়ক আরেকটি বিষয় তার সামনে এসে কাঁটা হয়ে দাাঁড়িয়ে ছিলো – আর তা ছিলো তার নাম সমস্যা। ১৯৭৫ সনের রাষ্ট্রীয় পট পরিবর্তনের ফলে দেশের স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রকাশ্যে সামনে আসার প্রয়াশ পায় এবং সেই সুবাদে নানান ধরনের উৎপাতের সৃষ্টি করতে শুরু করে, ওদেরকে সাথে ইন্দন যোগায় ধর্মীয় মৌলবাদীরা। প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসা স্হানীয় স্বাধীনতা বিরোধী ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা একজোট হয়ে স্বাধীন সুন্দরীর পরিবার পরিজনদের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে স্বাধীন সুন্দীরর নাম পরিবর্তনের জন্য। স্বাধীন সুন্দরী নাম নাকি ইসলাম সম্মত নয়। হুমকির পর হুমকি আসতে থাকে। শেষতক ভয়ে বাধ্য হয়ে তার নাম আংশিক পরিবর্তন করে করা হয় সুন্দরী বেগম। মোদ্দাকথা হলো স্বাধীনতা বিরোধীদের যতো ভয় এবং বিরাগ ” স্বাধীন ” শব্দটিতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তারা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি তাই স্বাধীন শব্দটিও তাদের নিকট অসহনীয় । এজন্য ইসলামের দোহাই পেড়ে তারা তাদের অন্তরের ভয় বিতাড়নের চেষ্টা করলো স্বাধীন সুন্দরীর নামের উপর হামলা করে।

স্বাধীন সুন্দরীর এখন একটিই মাত্র প্রত্যাশা রাষ্ট্রীয়ভাবে তার পিতা শহীদ জামাল উদ্দিনের “শহীদ ” স্বীকৃতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার পিতা মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্তচর হয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজ করে ছিলেন জীবন বাজী রেখে এবং জীবন দিয়েছেনও মুক্তিযুদ্ধের কাজ করার কারণে। আজ এই সত্যটুকু রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে স্বাধীন সুন্দরী তার বাবাকে অমর করে রাখতে চায় জগৎ সংসারে।

হাবিবের কাজ শেষ হতে দুপুর গড়িয়ে গিয়ে বিকেল হয়ে যায়। বিকেলের সোনারোদ শরীরে মেখে মেখে স্বাধীন সুন্দরীদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি ও হাবিব আমাদের নিজেদের গন্তব্যের দিকে পা ‘ বাড়াই শোকাহত শহীদ কন্যার সহমর্মিতা বুকের মাঝে পুষে নিয়ে।

লেখক- বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীন সাংবাদিক, গল্পকার ও কবি।

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

গোলাপগঞ্জে নৌকার সমর্থনে শিক্ষার্থী সংলাপ

'আমার নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ'- সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী

সিলেটে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ানডে ম্যাচ।। মঙ্গলবার রাত থেকে মিলবে টিকেট

বিয়ানীবাজার ক্রিকেট লীগ- ঈগলস ক্লাব খাসাড়ীপাড়াকে হারালো ঘুঙ্গাদিয়া স্পোর্টিং ক্লাব

বিয়ানীবাজার পৌর আ.লীগের সহ সভাপতি যুক্তরাজ্য প্রবাসী খছরুল হক মঙ্গলবার দেশে আসছেন

গোলাপগঞ্জ নাশকতার মামলায় দু'ইউপি চেয়ারম্যানসহ গ্রেপ্তার ৩

ঘোষণাঃ