১৮ই আগস্ট, ২০১৮ ইং | ৩রা ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

খালু, আপনি আরামে ঘুমান

https://i2.wp.com/beanibazarnews24.com/wp-content/uploads/2018/02/sss.png?resize=720%2C400

প্রথমে তাঁকে মামা ডাকতাম। ১৯৭৫ সালে আমার দুই নম্বর খালার সাথে বিয়ে হয়েছিল তাঁর চাচাতো ভাইয়ের। খালুর ভাই – মামা। আমার খালার বিয়ের সময় সঙ্গে গিয়েছিলাম আমি আর আমার বয়েসি আরেক কিশোরী, তিন নম্বর খালা, তাঁর নাম কুসুম। আমি আর কুসুম খালা নতুন কুটুম বাড়ি দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াই। এ ঘর ও ঘর যাই। আমাদের খালুর ঘরের উল্টা পাশে যে ঘরটি, সেখানে আমার বেশি খাতির। এই ঘরের বড় ছেলে তুলন মাস্টর, আমার সাক্ষাত স্যার। আর তাঁদের বাবা মশরফ আলী আমার বাবার স্যার। সন্ধ্যা বেলা আমি মশরফ নানার ঘরে গিয়ে বসি। তিনি আমাকে Tense ধরান। আমি জবাব দেই। তিনি বলেন, তোর বাফরে ফড়াইসি আমি, আর তোরে ফড়ায় আমার ফুয়ায়।

এটা দিয়ে এই পরিবারের সাথে আমার সম্পর্কের সূচনা হলেও চল্লিশ বছরে এই পরিবারের সাথে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক গুণিতক হয়। প্রথম পরিচয়ের পরের বছর আমার নানি কুসুম খালাসহ তাঁর তিন কন্যা আর দুই কিশোর পুত্রকে নিয়ে লন্ডন চলে যান। তাঁর দুই বছরের মাথায় তুলন স্যার (মামা)-এর ছোটভাই বেলাল মামাও লন্ডন চলে যান। সুন্দর, হ্যান্ডসাম, বাকপটু শিক্ষিত পুত্রাকে আমার নানি খুব আদর করতেন এবং একসময় শুনী তাঁর কিশোরী কন্যা কুসুমের সাথে সেই বেলাল মামার বিয়ে দেয়া হয়ে যায়। বেলাল মামা আমাদের বেলাল খালু হয়ে যান।

আশির দশকের বাঙ্গালী কম্যুনিটি পূর্ব-লন্ডনে খুব কঠিন সময় কাটিয়েছিল বলে শুনেছি। তারা বর্ণবাদের শিকার হত হামেসা। কুসুম খালা স্কুলের লিফটে উঠলে সাদা চামড়ার তরুণীরা হয় বেরিয়ে যেত বা তাঁকে পরের বার লিফট চড়তে বলত। গায়ে থু থু দিয়েছে এমনও শুনেছি। এসব সময়ে বেলাল খালু শুনী কম্যুনিটি লিডার হয়ে গেছেন, কাউন্সিলার হয়েছেন, এসব।
বাইরে নাম বেশি হলে ঘরে দাম কমে, এমন কথা বিখ্যাত লোকদের ক্ষেত্রে শুনলেও বেলাল খালুর ক্ষেত্রেও খানিক সত্য ছিল। ঘরে তাঁর খুব দাম ছিলো না। কারণও ছিলো। নেতাগিরি করতে গিয়ে সংসার চালানোর বিষয় মাথায় থাকতো না। ২৫ পেনির যে কয়েন দিয়ে রান্নার গ্যাস চালু করতে হতো, কখনো কখনো তাঁর রান্না ঘরে সেটারও নাকি যোগাড় থাকতো না। কুসুম খালা আমাকে প্রায়ই বলতেন, তুমার খালুর নিজর লাগি চিন্তা নাই বা, চিন্তা খালি কমিনিটির লাগি, পার্টির লাগি।

এসব কারনে বিষয়-সম্পত্তির প্রতি এক ধরনের নির্মোহ জীবন তিনি কাটিয়েই গেলেন। ছিলেন আমার নানার বাড়ির পরিবারের সবচেয়ে বড় অভিভাবক। নানা-নানির সবচেয়ে বড় নির্ভর । বয়স এবং যোগ্যতায় জ্যেষ্টতম বলেই পারিবারিক সকল সিদ্ধান্তই নির্ভর করতো তাঁর সিদ্ধান্তের উপর। মাথার উপর সব চেয়ে বড় ছাদ, ছোটদের জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

যুক্তরাজ্যে মা, খালাদের সাথে শাকুর মজিদ, সর্বডানে খালু বেলাল

২০০১ সালে আমার প্রথম বিলাত সফরে হিথরো বিমান বন্দর থেকে গিয়ে প্রথম তাঁর বাড়িতেই আমি উঠেছিলাম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য ছিলো এই সফর। তাঁর ঘরেই ডাকা হয়েছিলো আমাদের নানাবাড়ির সকল পরিবারকে। ৪০ বছরের ব্যাবধানে আমাদের নানা-নানীর চার প্রজন্ম এখন লন্ডনে বাস করছে প্রায় কুড়িটি আলাদা আলাদা পরিবারে। এখনো স্টেপনি গ্রিনের ৬ মীল্রুড হাউজের বাড়িটি নানার পরিবারের ১০ ডাউনিং স্ট্রিট।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সংগে আমার খুব বেশি দিন কাটানো হয় নি। দেশে এলে এক চক্কর দেখা আর আমি লন্ডন গেলে তাঁর বাড়িতে বেশিরভাগ আড্ডায় কথা হয়েছে। কিন্তু বিগত ৩-৪ বছর ধরে তাঁকে ভিন্ন রকমের মানুষ হিসাবে দেখি। আগের মতো রাশভারী কেউ নন। অসুখ বিসুখে কাবু হবে যাই যাই করে বেশ ক’বার হাসপাতাল থেকে ফেরত আসার কারনেই কী না জানি না, মনে হতো একজন শিশু হয়ে গেছেন তিনি। সাংগঠনিক কাজ থেকে অনেক অবসর নিয়ে নিয়েছেন। মধ্য আশিতে যুক্তরাজ্য যুবলীগ এর প্রতিষ্টাতা সাধারন সম্পাদক এখন রাজনীতির মূল স্রোত থেকে অনেকটা গুটিয়ে। টাওয়ার হ্যামলেটস এর কাউন্সিলার ছিলেন, এখন কিছুই নন। সময় কাটে ঘর আর হাসপাতালে । আর যখন সুযোগ হয়, মেতে ওঠেন পারিবারিক আড্ডায়। বছর দেড়েক আগে তাঁর নাতনি (আমার বড় ভাগনি)র বিয়ে খেতে লন্ডন থেকে খালাকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন আমেরিকায়। পুরো এক সপ্তাহ আমরা একসাথে কাটালাম। মিশিগানের পুরো বাংগালীপাড়া মাতিয়ে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। ২০১৫ সালে পরিবার নিয়ে গেলাম লন্ডন। তখন তিনি বেশ অসুস্থও। কিন্তু আমাদেরকে, বিশেষ করে আমার স্ত্রীকে ভালো করে বিলেত দেখানোর জন্য ব্যাকুল ছিলেন। প্রায় অসুস্থ অবস্থায় আমাদের নিয়ে গেছেন অক্সফোর্ড দেখাতে, নিয়ে গেছেন শেক্সপিয়ারের বাড়িতেও।

২০১৬ সালে তাঁকে সবচেয়ে উৎফুল্ল দেখেছিলাম যখন প্রথমবারের মত আমার আম্মা লন্ডনে গেলেন। তাঁকে নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ালেন তাঁর শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির প্রথম অভিবাসনের জায়গাগুলো। তিনি নিজেও স্মৃতিকাতর হয়ে গিয়েছিলেন। মধ্য সত্তুরে তাঁর নিজের অভিবাসন নিয়ে যে সংগ্রাম করেছিলেন, সেসব কথাও আমার ভিডিও ক্যামেরার সামনে অকপটে বলে গিয়েছিলেন।
২০১৬ সালেই তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা হয় লন্ডনে। সেবার বাংলাদেশ বইমেলা উপলক্ষে বেশ ক’জনের সাথে আমিও গিয়েছিলাম। লন্ডন বিমান বন্দর থেকে জামাল খানের গাড়িতে করে হোটেলে যাবার পথে নানা রকমের গল্প হয়। যেহেতু জামাল খানের সাথে আমার আগে পরিচয় ছিলো না, সুতরাং তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ঠতার ধারনা নিয়ে আমার পরিচিত কয়েক জনের নাম জিজ্ঞেস করি। জামাল খান হু হা করেন, স্পষ্ট কিছু বলেন না।
একবার বলি, আচ্ছা – আপনি শাহাব উদ্দিন বেলালকে চিনেন নাকি ?
এবার জবাবে তিনি বলেন- আপনি চিনেন কিভাবে ?
বলি – উনিও আমার আত্মীয় লাগেন।
জামাল খান বলেন – এই এতক্ষণে একজন জেনুইন লোকের নাম বললেন আপনি।
বুঝতে পারলাম, আমার খালুর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু ছিলো।

আজ (২৭ জানুয়ারি ২০১৮, শনিবার), আমি সারাক্ষণ খবর নিচ্ছি খালুর। ইস্ট লন্ডন মসজিদে তাঁর জানাজা হচ্ছে, কিছুক্ষণ পর তাঁকে সমাহিত করা হবে লন্ডনের এক কররস্থানে। এই নিয়ে মনটা বিষিয়ে আছে।
এর মধ্যে বড় এক আনন্দবার্তা আসে আমার। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছি। সাহিত্যে দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় পুরস্কার। এ খবরটা শুনলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন যিনি তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে সমাধিস্থ হবেন।
হিসেব করে দেখলাম, এখনো তাঁকে কবরে পোতা হয় নি। ভার্চুয়াল মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে গেসে। আচ্ছা, খবরটি কি তিনি পেলেন ? যদি পেয়েই থাকবেন, তবে আমাকে কিছু বলছেন না কেন ?
নাকি বলেছেন অনেক কিছু, আমি শুনতে পাইনি।
খালু, আপনি আরামে ঘুমান।
২৭ জানুয়ারি ২০১৮

A+ A-
Print Friendly, PDF & Email

সর্বশেষ সংবাদ

ঐতিহাসিক নানকার সৃতিসৌধে তিলপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের পুষ্পশ্রদ্ধা নিবেদন

বিয়ানীবাজারে ঐতিহাসিক নানকার দিবস পালিত

সিলেটে সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে অভিনব কায়দায় ছিনতাই

বিয়ানীবাজার থেকে নিখোঁজ স্কুলছাত্র সৃজন তালুকদার ফিরে এসেছে

জকিগঞ্জে ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

গোলাপগঞ্জ ঢাকাদক্ষিন বাজারে দুটি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি

ঘোষণাঃ